পাড়-বেষ্টনি না থাকায় হুমকীর মুখে পাশ্ববর্তী ফসলি জমি : প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ
- আপলোড তারিখঃ
১৮-০৪-২০১৮
ইং
দামুড়হুদা রামনগরে বিশালাকার পুকুর কেঁটে বালু উত্তোলন : পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু
তরুণ দত্ত: চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার রামনগর গ্রামের বেদনার বিল মাঠে একটি ফসলি জমি খনন করে বিশালাকার পুকুর কেঁটে তা থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছে আলামিন হোসেন নামের এক ব্যক্তি। প্রথমত ১-২ একর আয়তন নিয়ে পুকুরটি খনন শুরু করলেও বিগত ৩ বছর ধরে ড্রেজার মেশিন দিয়ে হরহামেশা বালু উত্তোলনের ফলে এখন ৪ একরে গিয়ে ঠেকেছে। তবে এই পুকুরের আয়তন বাড়াতে কাউকে কষ্ট করতে হয়নি। বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের ফলে পাশ্ববর্তী ফসলি জমি ভেঙে পুকুরের গর্ভে বিলীন হয়েছে। পুকুরটির গভীরতা কত- তা স্থানীয়দের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সম্প্রতি নাঈম রসূল (১০) নামের এক ৪র্থ শ্রেণীর স্কুল ছাত্র এই পুকুরের পানিতে ডুবে মারাও গেছে। শিশুটি দামুড়হুদা রামনগর হঠাৎ পাড়ার নাজমুল হকের একমাত্র ছেলে।
পুকুরে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাবাসী অবৈধ বালু উত্তোলন কারী রামনগর গ্রামের আলামিন হোসেন ওরফে ট্রাক্টর আলামিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন ও বিক্রি করছে সে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, কোন অনুমিত ছাড়াই প্রায় ৪ একর জমির উপর ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন করে বিশাল স্তুপ করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে বালু উত্তোলন করা না হলেও ওই স্তুপ থেকে বালু বিক্রি করা হচ্ছে। ওই পাহাড়সমান বালুর স্তুপ থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার বালু আশপাশের ইট ভাটা ও রাস্তার উন্নয়নমূলক কাজে সরবরাহ করা হচ্ছে। স্তুপ করা বালু শেষ হয়ে গেলে আবারো ড্রেজার মেশিন দিয়ে দু’তিনদিন ধরে রাতদিন বালু তুলে আবারো সরিয়ে ফেলা হয় ড্রেজার মেশিন।
এদিকে বালু বহণকারী ট্রাক্টরগুলোর যাতায়াতের জন্য ১০-১২টি ফসলি জমির উপর দিয়ে ১০-১৫ ফিট প্রশস্ত রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। এই রাস্তার কারণে জমিগুলোতে চাষাবাদ করা বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলেছেন, বেদনার বিল মাঠ থেকে বালু উত্তোলন করে তা রাস্তা পর্যন্ত আনতে যে জমিগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে তার জন্য আলামিন জমির মালিকদের মোটা অংকের টাকা দিচ্ছে। এ ছাড়াও পুকুরের চারপাশে পাড়-বেষ্টনি না থাকায় যেখানে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে তার আশপাশের জমিগুলোতে ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানায় কৃষকেরা। বালু উত্তোলন করার ফলে বেশ কয়েকটি পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তারা জানায়, এভাবে বালু উত্তোলন করতে থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে বীলিন হয়ে যাবে। তারা আরো জানায়, বালু উত্তোলন করতে নিষেধ করলে ট্রাক্টর আলামিন বলে- জমি ভেঙ্গে গেলে কিনে নিবো, তোমরা অন্য কোথাও কিনে নিয়ো। এই গরীব অসহায় মানুষগুলো চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলে- ‘আমাদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে আমরা কোথায় যাবো। শুধু তাই নয় আমাদের ছোট ছোট বাচ্চারা খেলতে গিয়ে যেকোন সময় পুকুরের পানিতে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নাঈমের মায়ের মতো যেন আর কোন মায়ের বুক খালি না হয়। তারা আরো জানায়, বছরের পর বছর এভাবে বালু উত্তোলন করে চলেছে; প্রশাসন কি দেখেনা?। আমাদের সন্তানরা যেন নিরাপদে থাকতে পারে। তাই আমাদের দাবি বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে এবং ট্রাক্টর আলামিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে মৃত নাঈমের বাবা নাজমুল জানায়, ‘আজ আমার ছেলের মৃত্যুর একটায় কারণ, বালু উত্তোলন করে তৈরী করা মানুষ মারার ফাঁদ। আমার ছেলে খেলতে গিয়ে লাশ হয়ে হয়ে বাড়ি ফিরলো। গত কয়েক দিন আগে অন্য এক শিশু বালি চাপা পড়ে পা ভেঙ্গে যায় এগুলোর দ্বায়ভার কে নেবে। তাই আমার দাবি বালু তোলা বন্ধ করা হক। আর না হলে আমি ট্রাক্টর আলামিনের নামে মামলা করবো।
এ ভাবে অবাধে বালু উত্তোলন ও বিক্রির অনুমতি প্রসঙ্গে আলামিন হোসেন বলেন, ‘ডিসির কাছে বসে বৈঠক করেছি আমরা। তাঁর অনুমতিতেই বালু বিক্রি করছি। এক সময় বালু উত্তোলন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করলে আমরা ডিসির সাথে আলোচনা করি। উত্তোলনকৃত বালু বিক্রির ব্যাপারে ডিসির অনুমতি রয়েছে; তাই বালু বিক্রি করে আসছি।’ তবে তার বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন লিখিত কাগজপত্র বা অনুমতিপত্র দেখাতে পারেনি আলামিন।
এদিকে ড্রেজিং করা পুকুরটি ক্ষণে ক্ষণে অগভীর আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি এই পুকুরের পানিতে ডুবে নাঈম (১০) নামে ৪র্থ শ্রেণীর এক স্কুল ছাত্র মারা গেছে। এরপরেও টনক নড়েনি তার। পুকুরটি অরক্ষিত ও চারদিকে খোলা মেলা হওয়ায় আবারো দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। এমন অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেন আলামিন হোসেন। তবে এখনও কোন পাহারাদার বা নিরাপত্তা রক্ষী রাখেননি তিনি। ফলে যে কোন সময় আবারো ঘটতে পারে বড় কোন দুর্ঘটনা।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে প্রশাসনের কোন অনুমতি নেই। বিষয়টি সম্পর্কে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
কমেন্ট বক্স