আলমডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে অফিসের বড়বাবু আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে। সেবা গ্রহীতাদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফিস পরিশোধের পরও দলিল দ্রুত এজলাসে উপস্থাপন এবং অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ অনুযায়ী, জমি ক্রয়-বিক্রয়, হেবা, দানপত্র, বণ্টনসহ বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় ফাইল আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে অনানুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের মাধ্যমে কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, অতিরিক্ত অর্থ সরাসরি নয়, বরং দলিল লেখকদের মাধ্যমে বড়বাবুর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের অর্থ লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে সাধারণ সেবাগ্রহীতার ছদ্মবেশে আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান। সেখানে জমি রেজিস্ট্রির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অফিসের অভ্যন্তরীণ খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে বড়বাবু আব্দুল হান্নান বলেন, ‘দলিল এজলাসে তুলতে হলে ২৫০০ টাকা দিতে হবে এবং সেই টাকা তার হাতেই জমা দিতে হবে।’
সাংবাদিকরা জানতে চান, এ অর্থের কোনো সরকারি ভাউচার পাওয়া যাবে কি না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘টাকা দেবেন, কাজ হবে; ভাউচার পেয়ে লাভ কী?’ পরে তিনি ওই অর্থকে ‘দলিল ফিস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকারি বিধি অনুযায়ী দলিল প্রতি নির্ধারিত ফি ৩৭০ টাকা। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ২১৩০ টাকা কোথায় যায়- এ প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, সপ্তাহে দুই দিন দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রমে দুই থেকে তিন শতাধিক দলিল সম্পন্ন হয়। সে হিসেবে মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১২০০ দলিল নিবন্ধিত হয়ে থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি দলিল থেকে অতিরিক্ত ২১৩০ টাকা আদায় করা হলে মাসিক অবৈধ অর্থ লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ১৭ লাখ টাকারও বেশি হতে পারে।
এদিকে সেবাগ্রহীতা নান্নু আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি দলিল নিবন্ধনের জন্য তার কাছ থেকে মোট ১ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান শুরু হলে তার বাড়িতে গিয়ে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এছাড়া সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলে বিভিন্নভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মহল থেকে হুমকি-ধমকির অভিযোগও পাওয়া গেছে। একটি সূত্র দাবি করেছে, আব্দুল হান্নান সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগে নকল নবীশ হিসেবে কাজ করতেন এবং বর্তমানে তিনি আলমডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বড়বাবুর দায়িত্ব পালন করছেন। একই সূত্রের দাবি, গত ছয় মাসে তিনি চুয়াডাঙ্গা সদরে প্লটসহ দুটি বাড়ি ক্রয় করেছেন। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রামাণ্য নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নিবন্ধিত দলিল লেখক জানান, অফিসে সমিতি কার্যক্রম না থাকলেও সমিতির নাম ব্যবহার করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। তার অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকার দালালরা নিজেদের দলিল লেখক পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে এবং পরে নিবন্ধিত দলিল লেখকদের নাম ব্যবহার করে দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন করছে।
অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলিল লেখকদের পারিশ্রমিক হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫০০ টাকা নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, বড়বাবুর ছত্রছায়ায় থাকা কিছু দালাল কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, ভূমি ও দলিল সংক্রান্ত সেবা মানুষের মৌলিক অধিকার ও সম্পত্তির নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্টার এস এম হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘বিষয়গুলো আসলে আমার জানা নাই, আপনার মাধ্যমে আমি জানলাম, আমি বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করে দেখব। পরবর্তীতে যেন লাইসেন্সপ্রাপ্ত দলিল লেখক ছাড়া কোনো ব্যক্তি আমার অফিসে দলিল নিয়ে প্রবেশ না করতে পারে, সে বিষয়টিও আমি কঠোরভাবে দেখব।’
অফিসের বড়বাবুর দুর্নীতি অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পরবর্তী দিন অফিসে গিয়েই তার সাথে কথা বলব এবং এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের অফিসিয়াল অভ্যন্তরীণ খরচ বলে টাকা-পয়সা নেওয়ার বিষয়ে আমার কোনো কিছু জানা নাই।’
এদিকে, সচেতন মহল অভিযোগগুলোর বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়, নিবন্ধন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ভ্রাম্যমান প্রতিবেদক,আলমডাঙ্গা