রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানটি সেখানে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দোতলা ভবনে বিধ্বস্ত হলে পাইলট ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শিক্ষার্থীসহ ১৭১ জন। এ ঘটনায় আজ এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে বিমান বাহিনীর এফ-৭ যুদ্ধবিমানটি বিকট শব্দে মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে আছড়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে বিমান ও স্কুল ভবনে। যে ভবনে এটি বিধ্বস্ত হয়- সেখানে বহু স্কুল শিক্ষার্থী ছিল। আগুনে ঝলসে যায় বহু শিক্ষার্থী। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উদ্বার কাজে ব্যস্ত ছিল ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, সেনা ও বিমান বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন। দুর্ঘটনার পর বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার এসে প্রথমে পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামকে উদ্বার করে সিএমএইচে নিয়ে যায়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পাইলট তৌকির। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির পাবনা ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। এক বছর আগে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পরপর উত্তরাসহ আশপাশের ৮টি ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হতাহতদের উদ্ধার করা শুরু করে। পরে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় বিজিবি ও সেনাবাহিনী। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে এবং বিভিন্ন অ্যাম্বুলেন্সে হতাহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিকেলের আগেই ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে সক্ষম হলেও ঘটনার ভয়াবহতায় মানুষজন শিউরে ওঠেন।
ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় আজ রাষ্ট্রীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসসহ শোক জ্ঞাপন করেছেন বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি এনসিপিসহ দেশের শীর্ষ রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যরা। এছাড়া ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শোক বার্তা দিয়েছেন।
সোমবার বেলা ১টা ৬ মিনিটে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানটি নিয়ে আকাশে ওড়েন পাইলট তৌকির ইসলাম সাগর। তিনি এদিনই প্রথম একাকি ফ্লাই করেন। এর আগে তিনি এক লাখ ঘণ্টার উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ নেন। বজ্র নামের ওই বিমানটি নিয়ে আকাশে উড়ে কিছু সময় পর অবতরণের চেষ্টা করছিলেন। ঠিক তখনই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতলা ভবন হায়দার হলে আছড়ে পড়ে বিমানটি। এ ঘটনায় বিমান বাহিনীর একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুুপুরে ওই ঘটনার পর পরই উপস্থিত লোকজন সেখানে জড়ো হতে থাকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়- তখন স্কুল ছুটির সময় ছিল। শিক্ষার্থীরা গেটে অপেক্ষা করছিলেন বাসায় যাওয়ার জন্য। হঠাৎ তারা দেখতে পান, একটি প্লেন সেখানে নিচু দিয়ে উড়ে এসে বিকট শব্দে ভবনটির গেটে মুখ থুবড়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তারা এ সময় একজনকে প্যারাসুট দিয়ে নেমে আসতে দেখেছেন। বিমানটি আছড়ে পড়ার পরই সেখানে আগুন ধরে যায়। আর ভবনের ভেতর থেকে দিগি¦দিক ছুটতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। মুহূর্তেই চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তার কিছু সময় পরে সেখানে একটি হেলিকপ্টার এসে পাইলটকে উদ্বার করে নিয়ে যায়। তারপর একের পর আসতে থাকে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, ও বিজিবিসহ অন্যান্য সংস্থার গাড়ি।
সেখানে এক তরুণী বলেন- ‘বলতে কষ্ট হচ্ছে। কীভাবে আমি তাদের উদ্ধার করেছি।’ ভয়াবহ এ ঘটনায় যখন চারদিকে আতঙ্ক আর বিভীষিকা, তখন সাহস করে হতাহতদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন কলেজ শাখার ওই শিক্ষার্থী। চোখের সামনে বিমান বিধ্বস্তের ভয়াবহ মুহূর্ত দেখেও ভয় না পেয়ে তিনি আহত শিশুদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ছুটির পর স্বাভাবিকভাবেই আমরা চলে আসছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ভয়ংকর একটি শব্দ হয়। পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তাও আমাদের প্রাইমারি স্কুল সেকশনে। কী ঘটনা হয়েছে, তা জানতে ওখানে যাই। পরে দেখি অনেক বাচ্চা খুব বাজেভাবে আহত হয়েছে। দু-তিনটি বাচ্চা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে- আপু বঁাঁচাও। এ অবস্থায় আমি কীভাবে তাদের ছেড়ে আসি! শিশুদের এমন আকুতি শুনে নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি।’ তিনি দ্রুত তাদের নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যালে যান।
যেখানে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে সেই ভবনটিতে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি মাধ্যমের ক্লাস হতো। ঘটনার আগে সবে সেখানে ক্লাস শেষ হয়েছিল। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী কাওসার বলেন, একটা ফাইটার প্লেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমাদের জুনিয়র ক্যাম্পাস- যেখানে ক্লাস ফাইভ থেকে এইটের ছেলেপেলেরা পড়াশোনা করে, ঠিক সেইখানে প্লেনটা পড়ছে ভাই। আমাদের ছোট ভাইয়েরা ছিল, সবাই ছিল ভাই। ওই খানে বলতে গেলে সবাই পুড়ে গেছে, সবাই ঝলসে গেছে। আমরা ভেতরে গেছিলাম, আগুনের কারণে কাউকে বের করিতে পারি নাই। খুব খারাপ অবস্থা।
আন্তজার্তিক সংবাদমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর:
এই দুর্ঘটনার খবর বিশ্বের একাধিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, দুর্ঘটনায় ১৯ জনের প্রাণহানির তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তাদের শিরোনাম ছিল, ‘কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ বিধ্বস্তে নিহত অন্তত ১৯’। রয়টার্সের বরাতে একই শিরোনামে প্রতিবেদন করেছে চীনা সংবাদমাধ্যম সিজিটিএন। ১৯ জন নিহত এবং শতাধিক আহতের তথ্য জানিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশের স্কুলে বিমানবাহিনীর জেট বিধ্বস্তে অন্তত ১৯ জন নিহত। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস শিরোনাম করেছে, ‘স্কুলে বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশের সামরিক বিমান, নিহত অন্তত ১৯’। মার্কিন বার্তাসংস্থা এপির শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘ঢাকার স্কুলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জেট বিধ্বস্তে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬।
রয়টার্সের বরাতে ১৯ জন নিহত এবং শতাধিক আহতের প্রতিবেদন করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুস্তান টাইমস। তাদের শিরোনাম, ‘ঢাকার মাইলস্টোন কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ জেট বিধ্বস্তে নিহত ১৯, আহত শতাধিক।’ এছাড়া উত্তরায় বিমান দুর্ঘটনার খবর দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ, সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্ট্রেইটস টাইমস, পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। এনডিটিভি, ডেকান হেরাল্ড, টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ ভারতের প্রধান প্রায় সব সংবাদমাধ্যমেও এ খবর প্রকাশ পেয়েছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন