দেশজুড়ে চলমান জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর পদযাত্রা এই প্রথম হামলার শিকার হলো। পতিত শেখ হাসিনার জন্মস্থান গোপালগঞ্জে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের মুহুর্মুহু হামলা, ককটেল চার্জ ও নানা অস্ত্র নিয়ে আক্রমণে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে সমাবেশস্থলসহ পুরো শহর। পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষে নিহত হয় ৪ জন। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু রাখতে গতকাল রাত ৮টা থেকে টানা ২২ ঘণ্টার কারফিউ জারি করছেন প্রশাসন। অপরদিকে বিচ্ছিন্নভাবে হামলাকারীরা জড়ো হয়ে গোপালগঞ্জ কারাগারেও হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। এসময় সন্ত্রাসীরা লোহাকাটা মেশিন দিয়ে জেলখানার প্রধান ফটকের গেট কাটার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও কারারক্ষীদের ব্যারাকে ব্যাপক ধ্বংসকা- চালায়। এসময় বহু কারারক্ষী তাদের জীবন বাঁচাতে গায়ের পোশাক খুলে বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়।
গোপালগঞ্জের সংঘর্ষের ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ড. জীবিদেশ বিশ্বাস গণমাধ্যমকে বলেন, গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে এ পর্যন্ত চারজনের লাশ হাসপাতালে এসেছে। তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সংঘর্ষ চলাকালে বহু লোক আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, তবে তাদের সংখ্যা কত তা কেউ বলেননি। হামলায় এনসিপির একজন নেতাও আহত হওয়ার কথা চাউর আছে। তবে কারাগারের জেল সুপার জেলার কেউ তথ্য না দিলে কারারক্ষীরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, সেনাবাহিনী এসে পড়ায় আমরা জানে বেঁচে গেছি।
শহরে পুলিশের সহায়তায় ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শহর ও উপশহরে চলছে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। চলছে ধরপাকড়ও। সেনাবাহিনী প্রথম দফায় নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, আক্তার হোসেনসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের নিরাপদে গোপালগঞ্জ থেকে বের করে নিয়ে আসে। পরে ইটপাটকেল নিক্ষেপকারীদের মাঝে আটকে পড়া পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকদের সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়।
এদিকে গোপালগঞ্জে পদযাত্রায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিবাদে সারাদেশে ব্লকেড ঘোষণা করে এনসিপি। কেন্দ্রীয় নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারাদেশে সড়কে ব্লকেড সৃষ্টি করে এনসিপির নেতা-কর্মীরা। ফলে পথে হাজার হাজার গাড়ি আটকা পড়ে। বিড়ম্বনায় পড়েন লাখ লাখ যাত্রী। অবশ্য পরে ব্লকেড তুলে নিলে যানচলাচল শুরু হয়। গতকাল বুধবার ছিল গোপালগঞ্জে পূর্বঘোষিত এনসিপির পথযাত্রা। এখানে বেলা ২টায় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের নেতৃত্বে ৬-৭ জনের একটি দল গোপালগঞ্জ আসেন। পদ্মা সেতু হয়ে টেকেরহাট হয়ে গোপালগঞ্জে আসেন নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। পথে পথে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিñিদ্র নিরাপওা। তারপরও গোপালগঞ্জ চৌরাঙ্গীর মোড়ের গতকালের পথযাত্রা সভামঞ্চে আসতে তাদের কমপক্ষে ২৫টি গাড়িবহরকে একাধিকবার বাধার মুখে পড়তে হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১৭-১৮টি গাড়ি প্রোটোকল দিয়ে গোপালগঞ্জ সভামঞ্চে আনে তাদের।
সময় তখন বেলা প্রায় ১টা। হটাৎ চারদিক থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হেলমেট পরে, কেউ লাঠি হাতে, কেউ রড-হকিস্টিক নিয়ে পুলিশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এলোপাতাড়ি সভামঞ্চের প্রায় ৫০-৬০টি চেয়ার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে হুড়মুড় করে খাল পার হয়ে চলে যায়। এর আগে বেলা ১১টায় শহরে লিংক সড়ক আটকিয়ে গাছের বড় বড় গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে। তৃতীয় বার তখন দুপুর ১২টায় চৌরাঙ্গীর খাল পাড়ের বিপরীত দিক থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে। এসময় পুলিশের ২ জন সদস্য আহত হয়। আহতদের পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এর আগে শহরতলীতে পুলিশের একটি গাড়িতে হঠাৎ হামলা করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। ওখানেও দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়।
এদের সকলকে দেখতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখতে শহরে পরিদর্শনে থাকা সদর নির্বাহী অফিসার মো. রাকিল হাসান আহত পুলিশদের দেখার উদ্দেশে হাসপাতালমুখী হলে পথিমধ্যে তার গাড়ির ওপর হামলা করে গাড়িটি ভাঙচুর করে বিপথগামীরা। এসময় পুলিশ নিরাপওা জোরদার করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পিঁপড়ার সারির মতো মিছিলে যোগ দেন বহু নারী। শহর পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। অপরদিকে গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশ শেষে ফিরে যাওয়ার সময় সড়ক অবরোধ করে কেন্দ্রীয় নেতা-কর্মীদের গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এই হামলা হয় তৃতীয় দফায়। এ ঘটনার পর গোপালগঞ্জে ১৪৪ জারি ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। দুপুরে জেলা প্রশাসন এ ঘোষণা দেয়।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও সেখানে অবস্থান নেয়। গোপালগঞ্জ শহর থেকে শহরের পৌর পার্ক ও লঞ্চঘাট এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বেলা আড়াইটার দিকে যখন এনসিপি নেতাদের গাড়িবহর ওই এলাকা অতিক্রম করার চেষ্টা করে, সেই সময় তাদের ওপর ককটেল ও ইটপাটকেল হামলা শুরু হয়। ফাঁকা গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছুড়েও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের সাথে হামলাকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এসময় বিপথগামীদের আক্রমণে বহু মানুষ আহত হয়।
সমাবেশস্থলের মঞ্চের পাশাপাশি চেয়ারগুলো রাস্তায় এনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের সামনে। শহরের সব দোকানপাট বন্ধ এবং যানচলাচলও কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফরিদপুরে আজ এনসিসিপির একটি প্রোগ্রাম আছে সদর থানার জনতা ব্যাংকের মোড়ে। গোপালগঞ্জের এ ঘটনায় এখানেও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছেন সাধারণ জনতা। উল্লেখ্য, গোপালগঞ্জ সদরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মাসব্যাপী কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ‘জুলাই পদযাত্রা’কে কেন্দ্র করে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এ কথা এখন সকলের মুখে মুখে। আওয়ামী লীগ নেই। তবে এরা কারা?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রথম সাধারণ নাগরিক হয়ে ঘটনাস্থলে সমবেত হয়। একপর্যায়ে তারা গোপালগঞ্জ টহল পুলিশের একটি টিমকে লক্ষ করে হামলা চালায়। এসময় পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ হামলায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক (আইসি) আহমেদ বিশ্বাস, কনস্টেবল কাওছার এবং মিনহাজ আহত হয়েছেন। আহত তিন পুলিশ সদস্যকে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অপর একজনের নাম জানা যায়নি। ঘটনার খবর পেয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, ‘কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে আমরা এখন পর্যন্ত জানি না। তবে আমাদের পুলিশের তিনজন সদস্য আহত হয়েছে এবং একটি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। আহত ওই তিন সদস্যকে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’ গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির প্রথম সারির নেতাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে তারা সকলেই বললেন, এ মুহূর্তে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না, তবে সময় হলে কথা বলব। অপরদিকে, পথসভায় এসে নাগরিক পার্টির (এনসিপির) উওরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক তার বক্তব্য একটি কথা বলে শেষ করেন তার বক্তব্য ছিল, ‘এদেশে নতুন কোনো শোষক আমরা চাই না।’
সমীকরণ প্রতিবেদন