ঘড়ির কাঁটায় তখন পৌনে ১টা। আদালতকক্ষে পিনপতন নীরবতা। ট্রাইব্যুনালের কাচঘেরা কাঠগড়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট পাঁচটি অভিযোগ পড়ে শোনায় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি দোষী না নির্দোষ? বিচারকের জিজ্ঞাসার জবাবে চেয়ারে বসা মামুন দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আমি দোষী। মামলার সমস্ত বিষয়বস্তু সম্পর্কে যা জানি, তা আমি স্বেচ্ছায় ও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সম্পূর্ণরূপে সত্য প্রকাশ করতে সম্মত আছি।’ এই বক্তব্যের পরই ট্রাইব্যুনালে রাজসাক্ষী হতে আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করেন তিনি। আবেদন মঞ্জুর করে মামলার তিন আসামি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি মো. গোলাম মূর্তজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন।
আদেশে বলা হয়েছে, আসামিদের নির্দেশে ও জ্ঞাতসারে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অপরাধসমূহ ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে। সে জন্য মামলার আসামি শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে দাখিল করা অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে তিন আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর নির্দেশ দেওয়া হলো। এছাড়া আগামী ৩ আগস্ট মামলায় চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এম তাজুল ইসলামের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং পরদিন সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এসময় চিফ প্রসিকিউটর এম তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ, গাজী এম এইচ তামিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌঁসুলি আমির হোসেন। অভিযোগ গঠনের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দায়ের করা প্রথম মামলার বিচার শুরু হলো। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের মামলায় এই প্রথম রাজসাক্ষী হওয়ার ঘটনাও এটি।
আন্দোলনকারীদের নিশ্চিহ্নের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাসিনা:
তিন আসামির মধ্যে বিচারের শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন শেখ হাসিনা ও কামাল। গ্রেপ্তার আছেন গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব পালন করা চৌধুরী মামুন। রাজসাক্ষী হওয়ায় তিনিই এখন আসামির পাশাপাশি সাক্ষী হিসেবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পূর্বাপর নিয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেবেন। তার সাক্ষ্যে উঠে আসবে শেখ হাসিনা কীভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুলি চালিয়ে আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা আন্দোরলনরত ছাত্র-জনতাকে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের কাছে। শেখ হাসিনার এই নির্দেশ অবহিত করা হয় সাবেক আইজিপি মামুনকে। মামুন তার অধীনস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলেন। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহারের নির্দেশনা পেয়ে মাঠ পর্যায়ে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের অধিক নাগরিককে গুরুতর জখম করেছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় এই তিন আসামি কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
রাজসাক্ষী মামুন পৃথক সেলে:
রাজসাক্ষীর আবেদন মঞ্জুরের পর কারাগারে চৌধুরী মামুনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পৃথক সেলে রাখার আবেদন করেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জায়েদ বিন আমজাদ। তিনি বলেন, আমার মক্কেলের বক্তব্যকে ধারণ করে একটি আবেদন করছি যে, তাকে যেন কারাগারে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হয়। যেহেতু তিনি রাজসাক্ষী হয়েছেন, সেহেতু তার জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাকে পৃথক সেলে রাখার আদেশ দেওয়া হোক। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে কারাগারে মামুনকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে ও পৃথক সেলে রাখার আদেশ দেয়। আদেশের অনুলিপি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছলে তাকে পৃথক সেলে রাখা হয় বলে জানিয়েছেন জেলার এ কে এ এম মাসুম।
সুনির্দিষ্ট পাঁচ অভিযোগে বিচার শুরু:
বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে গত বছর কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। মধ্য জুলাই পর্যন্ত আন্দোলন ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ১৪ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজাকারের সন্তান ও নাতিপুতি বলে গালি দেন। এই উসকানিমূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই আন্দোলন তীব্রতর হয়। হাসিনার দেওয়া ঐ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কামাল, মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা ও সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে হামলা চালায়। এই হামলার মাধ্যমে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতন করা হয় ছাত্র-জনতাকে। এসব ঘটনায় আসামিদের প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদান না করা এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে।
এছাড়া আন্দোলনকারীদের দমনে হেলিকপটার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। কামাল ও মামুন এই নির্দেশ বাস্তবায়নে তাদের অধীনস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন। ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণের অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুক লক্ষ্য করে গুলি করে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গত ৫ আগস্ট ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে ছয় জনকে হত্যা করে। এই হত্যা সংঘটিত হয়েছে তিন আসামির জ্ঞাতসারে এবং তাদের দেওয়া নির্দেশের কারণে। এছাড়া ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় ছয় জনকে গুলি করে হত্যা ও তাদের লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আসামিদের দায় রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ দাখিল হয়। গত ১৭ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। গত ১২ মে শেখ হাসিনা, কামাল ও মামুনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। সেই তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গত পহেলা জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়।
সমীকরণ প্রতিবেদন