বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

প্রতারণার ফাঁদে পা দেবার কারণ বেকারত্ব নাকি বেশি লাভের আশা?

  • আপলোড তারিখঃ ০৭-১১-২০২০ ইং
প্রতারণার ফাঁদে পা দেবার কারণ বেকারত্ব নাকি বেশি লাভের আশা?
এসপিসিতে লোকসান যাওয়ার সম্ভাবনা আছে জেনেও বিনিয়োগ : চুয়াডাঙ্গার বহু তরুণের মাথায় হাত! মেহেরাব্বিন সানভী: ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’ কোম্পানিতে টাকা লোকসান যাওয়ার সম্ভাবনা আছে জেনেও অতিরিক্ত লাভের আশায় বিনিয়োগ করেছিলো চুয়াডাঙ্গার বেশ কিছু তরুণ-যুবক। উচ্চ কমিশনের আশায় সব হারিয়ে এখন তাঁরা পথে বসেছে। প্রশ্ন উঠছে বেকারত্বের হতাশা নাকি অতিরিক্ত টাকার লোভে মাত্র ১০ মাসেই ২২ লাখ গ্রাহকের ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিলো নামমাত্র কোম্পানিটি। জানা গেছে, অনলাইনভিত্তিক এমএলএম পরিচালনা করে সাধারণ মানুষকে বেশি কমিশনের প্রলোভন দিয়ে ই-কমার্সের নামে গত জানুয়ারিতে প্রতারণা শুরু করে এসপিসি ওয়ার্ল্ড। এতে ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হতো। নিবন্ধনের রেফারকারী কমিশন পেত। রেফারকারী তার নিচের তিনটি আইডি থেকে ৪০০ টাকা করে কমিশন পেত। তারপর ওই তিন আইডি থেকে যখন নয়টি আইডি হতো, তখন আপলিঙ্কের আইডি ২০ শতাংশ কমিশন পেত। আর ডাউনলিঙ্কে যত আইডি হবে, আপার আইডি ১০ শতাংশ কমিশন পেত, যা পিরামিড আকৃতিতে বৃদ্ধি পেত। আইডি খোলার প্রক্রিয়া ছিলো, গুগল অ্যাপস থেকে এসপিসি ওয়ার্ল্ড অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে। প্রতি আইডির জন্য ১২শ টাকা করে বিকাশ, রকেট বা নগদের মাধ্যমে কোম্পানীতে পাঠাতে হবে। কোম্পানী একটি পিন দিবে, সেই পিন দিয়ে আইডি খুলতে হবে। এসময় একটি রেফার আইডি (সংযুক্তকারীর আইডি নং) দিতে হবে। একই অ্যাপস দিয়ে একই নামের বা এক জনের অসংখ্য আইডি খোলা বা চালানো যাবে। আর মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, রকেট আর নগদের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে পিনের মাধ্যমে আইডি খোলার এই প্রক্রিয়াও ছিলো খুব সহজ। এসপিসির নিয়ম অনুযায়ী আপার আইডি হলো, কেউ আইডি খুললে পূর্বে যার আইডির রেফরেন্স দিবে সেটি। আর ডাউন আইডি হলো যেই আইডি নতুন খোলা হবে সেটি। মূলত কোম্পানির ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে শত শত পোস্টের মাধ্যমে ই-কমার্সের নামে সাধারণ মানুষকে লোভনীয় কমিশনের কথা বলে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়। এই ফাঁদে পা দিয়েছে চুয়াডাঙ্গারও বেশ কিছু তরুণ ও যুবক। কেউ কেউ বেকারত্ব দুর করতে বিনিয়োগ করেছে, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত লাভের আশায়। কথা হয় আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী এলাকার আবিদ উল্লাহর (ছদ্মনাম) সাথে। ফেসবুকের মাধ্যমে এসপিসি ওয়ার্ল্ডের কথা জানতে পারে সে। যুবক বয়সে বেকাত্বের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে বাড়িতে চাপ দিয়ে পরিবারের শেষ সম্বল একটি বড় গরু বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে ৮৩টি আইডি খোলে সে। প্রত্যেকদিন আইডিগুলোতে ঢুকে মাত্র কয়েক মিনিট অ্যাড রিভিউ দেখতো সে। এমন করে তাঁর একাউন্টে প্রায় ৯০ হাজার টাকাও জমা হয়েছিলো। কোম্পানির শর্তমতে ৫০ দিনের আগে টাকা উঠানো যাবে না। তাঁর আইডিগুলোর প্রথমবার ৫০ দিন হতে আর মাত্র একদিন বাকী ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই কোম্পানীর এমডি আলামিন প্রধান পুলিশের হাতে আটক হলে তাঁর আইডিও বন্ধ হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ জানান, পরিবারের শেষ সম্বল হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। বেকারত্ব তো কাটলোই না, বরং যা ছিলো, তাও হারালাম। অপরদিকে, কথা হয়, মুন্সিগঞ্জ এলাকার সোহেদুরের (ছদ্মনাম) সাথে। চুয়াডাঙ্গা সরকাারি কলেজের দর্শন বিভাগের অর্নাস প্রথম বর্ষের ছাত্র সে। মোবাইল ফোন কেনার জন্য বাসা থেকে ২০ হাজার নিয়েছিলো। কোনোমতে পরিবারকে বোঝায় একমাস পর সে ফোন কিনবে। সেই টাকা দিয়ে এসপিসিতে একাউন্ট খোলে সে। কিন্তু মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই এসপিসি বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারে বোঝানোর কোনো উপায় নেই তার কাছে। নিজের ভুল স্বীকার করে রহমান বলেন, আমি ভেবেছিলাম, ৫০ দিনে আমার টাকা পূর্ণ হয়ে যাবে। সেটা উঠিয়ে মোবাইল ফোন কিনবো। আর একাউন্ট তো থেকেই যাচ্ছে। সুতরাং, আয়ের উৎসও থাকছে। কিন্তু এখন কিছুই নেই। পরিবারে বলার সাহসও নেই আমার। সরকার উদ্যোগ নিয়ে যদি এসপিসির একাউন্টগুলো অনুযায়ী সবার মূলধনটি ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা অনেক বড় উপকার পাবো। এদিকে, চুয়াডাঙ্গা শহরের কলেজপাড়ার ভার্সিটি পড়ুয়া শাফায়েত (ছদ্মনাম) জানান, গত আগস্ট মাসে সে এসপিসিতে প্রায় ৪২ হাজার টাকা ব্যয়ে বেশ কয়েকটি একাউন্ট খোলে। ৫০ দিন পূর্ণ হলে বিকাশের মাধ্যমে সে প্রায় ২৫ হাজার টাকা উঠায়। লাভজন ভেবে বাসা থেকে আরো কিছু টাকা নিয়ে আরো বেশি লাভের আশায় বিনিয়োগ করে। কিন্তু সে ভাবিনি, এতো অল্প সময়ে এসপিসি বন্ধ হয়ে যাবে। সে জানত এর আগেও ডেসটিনিতে অনেকই প্রতারিত হয়েছেন। তবে তাঁর ধারণা ছিলো, ডেসটিনি ১২ বছর ব্যবসা করেছে। সে হিসেবে এসপিসি কয়েক বছর তো করতেই পারে। তাই সে রিস্ক নিয়েছিলো। শাফায়েত বলেন, এতো তাড়াতাড়ি ঠকবো, সেটা ভাবিনি। ভুলটা আমাদের, সেটা মানছি। তবে, সরকারের কাছে আবেদন, আমাদের টাকাগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য সরকার যাতে কিছু একটা ব্যবস্থা করে। চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মাঝেরপাড়ার রাফি (ছদ্মনাম) নিজের শখের ল্যাপটপ বিক্রি করে, এসপিসিতে খুলেছিলো ২০টির মতো আইডি। কিন্তু একবারও সামান্য কিছু টাকাও উঠাতে পারিনি। তবে সে জানায়, তার এক পরিচিত ভাই শুরু থেকেই এসপিসিতে ছিলো। এসপিসির থেকে পাওয়া লাভের টাকায় সে একটি মোটর বাইক কিনেছে। তাকে দেখেই সে এসপিসিতে বিনিয়োগ করে। রাফি বলেন, শখের ল্যাপটপ বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য। লাভ তো দুরের কথা, সব টাকাই হারালাম। চুয়াডাঙ্গা শহরের কোর্টপাড়ার শাকিল (ছদ্মনাম) ঢাকার একটি কলেজে স্নাতকে পড়ছেন। করোনাভাইরাসের কারণে তিনি এখন চুয়াডাঙ্গা আছেন বেশকিছুদিন। তিনি বলেন, ‘টিউশনি করে জমানো ও বাবার থেকে টাকা নিয়ে আমি গত মাসের শুরুতে এসপিসিতে মোট ৩৬টি আইডি খুলি। পরিচিত একজনের মাধ্যমে আমি এ ব্যবসায় আসি। সব টাকা ধরা খেয়েছি। আমরা ক্ষতিপূরণ পাবার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। মিরাজ আহম্মেদ (ছদ্মনাম) নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘করোনার কারণে ফেঁসে যাচ্ছেন লভ্যাংশ গ্রহণকারীরা সিঙ্গাপুর থেকে দেশে এসে আমি আটকা পড়ি। এরপর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দুই মাস আগে এ ব্যবসা শুরু করি। ৫শটি আইডি খুলে আড়াই লাখ টাকার ওপরে ক্ষতি হয়েছে আমার। এসপিসির প্রতারণার এই কাহিনী বলতে গেলে, বহু মানুষের কষ্টের কথা উঠে আসবে। কেউ কেউ বেকারত্ব দুর করতে বিনিয়োগ করেছে, আবার কেউ দ্রুত বেশি লাভের আশায়। তবে প্রতারিত হয়েছেন সকলেই। এদিকে, গত পরশু বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গার শহরের টাউনমাঠে এসপিসির এমডি আলামিন প্রধানের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছে বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী। তাঁদের মতে এসপিসির মালিক তাদের সাথে প্রতারণা করেননি। তারা ব্যবস্যা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু পিরামিড আকারে বৃদ্ধি পাওয়া এই ব্যবসা পদ্ধতি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। তাছাড়া, গোপন সূত্রে জানা গেছে, একটি মহল গোপনে এসপিসির বিনিয়োগকারীদেরকে বোঝানোর পাঁয়তারা করছে, যে এসপিসি ফাঁিক দিবে না। এমডি মুক্তি পেলে ব্যবস্যা এবং লাভ আবার আগের মতো দেওয়া হবে। অন্যদিকে, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা বলছে লেনদেন ২৬৮ কোটি টাকার হলেও, ব্যাংকে এসপিসির পুজি আছে মাত্র ১২ কোটি টাকা। তাঁরা অনুসন্ধান চালাচ্ছে, বাকী টাকাগুলো কোথায় গেলো। অপরদিকে, সুধীসমাজ বলছে, এই ধরণের প্রতারণা ফাঁদে পড়ার প্রধান কারণ হলো বেকারত্ব। তাই আগামীতে যেন এমন কিছু না হয়, সেজন্য বেকারত্ব কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে এ সকল ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেকার যুবকদের প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা আরো বেশি হতে পারে।


কমেন্ট বক্স
notebook

ফুফুর টাকা হাতিয়ে নিতে ভাতিজার ‘ছিনতাই নাটক’