বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

জীবাণুনাশে ব্যবহৃত রাসায়নিক বাড়াতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকি!

  • আপলোড তারিখঃ ২১-০৭-২০২০ ইং
জীবাণুনাশে ব্যবহৃত রাসায়নিক বাড়াতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকি!
জীবাণুনাশক টানেল স্থাপনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন ভিন্ন পরিপত্র, বিশেষজ্ঞদের অভিমত মেহেরাব্বিন সানভী: করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সময়কালে জীবাণুনাশক টানেল নিয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন ভিন্ন পরিপত্র, সর্বপ্রথমে একবার টানেল স্থাপনের নির্দেশনা, আরেক পরিপত্রে পুরোটাই বাদ দিয়ে দেওয়া। এই রকম নির্দেশনায় বিভ্রান্তিতে পড়েছেন সাধারণ জনগণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাণুনাশক হিসেবে টানেলে ব্যবহৃত রাসায়নিক মানুষের ত্বক, চোখ ও মুখে পড়লে চরম ক্ষতি হতে পারে। আবার স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনায় জীবাণুনাশক টানেল স্থাপনের বিধান তুলে দিয়ে নতুন নির্দেশনা জারির পরও চুয়াডাঙ্গা শহরের বেশকিছু স্থানে চালু আছে এ জীবাণুনাশক টানেল। আবার সাম্প্রতিক নির্দেশনা সম্পর্কে না জানার কারণে কেউ কেউ চালু থাকা টানেলে জীবাণুমুক্ত হতে প্রবেশ করছেন। এতে করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন তাঁরা। এদিকে, মন্ত্রণালয়ের অল্প সময়ের ব্যবধানেই স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনার প্রথম নির্দেশনাটি বাদ দেওয়ায় টানেল এবং টানেলে ব্যবহৃত রাসায়নিক নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা প্রকার বিতর্ক। জানা গেছে, ১১ মে মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত দেওয়া নির্দেশনায় একেবারে প্রথমে জীবাণুমুক্তকরণ টানেল স্থাপনের নির্দেশনা ছিল। সে সময় চুয়াডাঙ্গায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে প্রথম টানেল স্থাপন করা হয় শহীদ হাসান চত্বরে। পর্যায়ক্রমে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান উদ্যোগে চুয়াডাঙ্গা শহরের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানে জীবাণুনাশক টানেল স্থাপন করা হয়। একেকটি টানেলে ১৮ হাজার থেকে ৪০ হাজার বা তার থেকে বেশি টাকা খরচ হয়। কিন্তু পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টানেলের এ সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিমত দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ ধরনের টানেলে ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে। টানেল স্থাপন বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীও সংশ্লিষ্টদের উকিল নোটিশ পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে টানেল স্থাপনের নির্দেশনাটি প্রত্যাহার করা হয়। এই নির্দেশনাটি বাদ দেওয়ায় বাকি ১২টি স্বাস্থ্যবিধি প্রযোজ্য করা হয়। এদিকে, চালু থাকা টানেল মালিকেরা বলছেন, চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে টানেল স্থাপনের সময় যে রকম উৎসাহিত করা হয়েছিল, বন্ধ করতে কোনো প্রকার নিরুৎসাহিত করা বা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় জীবাণুনাশক টানেলের ধারণা বাস্তবায়ন করতে গেলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। একজন মানুষ শপিংমলে গিয়ে অনেক মানুষের সংস্পর্শে আসার পর বের হওয়ার সময় টানেলের মধ্যে দিয়ে বের হয়ে এসে নিজেকে জীবাণুমুক্ত মনে করতে পারেন এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এতে ওই ব্যক্তির মধ্যে ফলস সেফটির ধারণা তৈরি হলে সতর্কতা কমবে, এতে উল্টো বিপদ তৈরি হতে পারে। ব্লিসিং পাউডার ও হাইড্রোজেন পার অক্সাইড সলিউশন দিয়ে তৈরি রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে এ ধরনের টানেল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন করেনি। ফলে এই ধরনের পদক্ষেপ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য উল্টো ক্ষতিকর। অন্য একটি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক রসায়নবিদ সুলতানা রাজিয়া বলেন, রাসায়নিক টানেলে সংস্পর্শে এলে স্বল্পমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হতে পারে। ব্লিসিং পাউডার জীবাণুনাশক হিসেবে কার্যকর হলেও তা সরাসরি মানুষের শরীরের সংস্পর্শে এলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই ধরণের কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলে চামড়ায় জ্বালাপোড়া, ত্বকের বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে শুরু করে চোখের সমস্যা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বারবার সংস্পর্শে আসতে থাকলে আরও জটিল সমস্যা তৈরি হতে পারে। ব্লিসিং পাউডারের মূল উপাদান ক্লোরিন মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এদিকে, চুয়াডাঙ্গা শহরের বিভিন্ন স্থানের টানেলগুলো সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরের টানেলটি বন্ধ করা আছে। তবে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের টানেলটি চালু। সদর থানার টানেলটি বন্ধ করা আছে। চুয়াডাঙ্গা বিগ বাজারের সামনে দেওয়া টানেলটি মাঝে মধ্যে চালু আর মাঝে মধ্যে বন্ধ থাকে। চুয়াডাঙ্গা সমবায় নিউ মার্কেটের টানেলটিরও একই অবস্থা। বড় বাজার শহীদ হাসান চত্বরের টানেলটি বেশ কয়েকদিন ধরে বন্ধ করা আছে। আব্দুল্লাহ সিটির টানেলটি চালু আছে। অন্যদিকে, প্রিন্স প্লাজা, বড় বাজার বড় গলির টানেল থেকে থেকে চালু থাকে আবার থেকে থেকে বন্ধ থাকে। কথা হয় চুয়াডাঙ্গা বিগ বাজারের মালিক আজিজুল হকের সঙ্গে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সামনে একটি টানেল আছে। টানেলটি চালু আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা ছিল আমাদের প্রতি। প্রতিষ্ঠান চালু করতে হলে টানেল স্থাপন করতে হবে। জেলা প্রশাসক মহোদয়ও আমাদের এ রকম নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা মেনেই আমি টানেলটি চালু রাখছি। তবে পরবর্তীতে প্রশাসন বা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে টানেল বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশনা পাইনি। যদি এতে ক্ষতি থাকে এবং প্রশাসন বন্ধ রাখার অনুমতি দিই, আমি অবশ্যই মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে এটি বন্ধ রাখব।’ চুয়াডাঙ্গা সমবায় নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মিজাইল জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা টানেল স্থাপন করেছি। আমাদের টানেলটি চালু আছে। সরকারিভাবে যেমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, আমরা সেটিই পালন করছি।’ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শামীম কবির বলেন, টানেলের নির্দেশনাটি প্রথমে থাকলেও পরে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা নেই। আর সরকার টানেলের প্রতি গুরুত্বও দিচ্ছে না। তা ছাড়া টানেলে ব্লিসিং পাউডার ব্যবহার করা যাবে না। তবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার যেটা সেটা ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন চোখে ও মুখে না পড়ে। চোখে মুখে পড়লে সমস্যা হতে পারে। চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান বলেন, ওয়ার্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন অথবা আইইডিসিআর-এর মতে একটি আদর্শ জীবাণুনাশক টানেলে ব্যবহৃত সলুশনে ৭০% এলকোহল থাকবে। ডিটারজেন্ট পাওডার মিশ্রিত পানি দিয়ে হাত ধোয়া যাবে। তা জীবাণুনাশও করবে। তবে, সরাসরি ডিটারজেন্ট বা সাবান মিশ্রিত পানি চোখে, মুখে গেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘সরকারের দেওয়া প্রথম নির্দেশনাতে টানেলের কথা উল্লেখ ছিল। তবে পরে এ নির্দেশনাটি বাদ দিয়েছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে কি না, সে রকম কোনো নির্দেশনা নেই। আমরা নতুন করে টানেলের নির্দেশনা দিচ্ছি না। আবার টানেল তৈরির জন্যও বলছি না। আসলে যেই টানেলগুলো চালু আছে, এগুলোতে সাবান পানি ব্যবহার করা হয়। যাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। যদি টানেলগুলো চালু রাখতে হয়, তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই, এমন কিছু এতে ব্যবহার করতে হবে।’ টানেলগুলো চালু না রেখে যদি কেউ বন্ধ করে সে ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, যেহেতু সরকার আর টানেলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে না, তাই তাতে আপত্তি নেই। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে জ্বর আছে কি না, দেখতে হবে। মাস্ক পরতে হবে।


কমেন্ট বক্স
notebook

ফুফুর টাকা হাতিয়ে নিতে ভাতিজার ‘ছিনতাই নাটক’