স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি!
- আপলোড তারিখঃ
২৯-০৬-২০২০
ইং
জীবননগর প্রতিনিয়ত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, ২৬ জনের করোনা শনাক্ত
ইসলামী ব্যাংক লকডাউন ঘোষণা করায় ২৫ হাজার গ্রাহক বিড়ম্বনায়
এ আর ডাবলু:
জীবননগর উপজেলায় দিন দিন বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। ফলে উপজেলাজুড়ে সর্বত্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা জীবননগরের ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের ৩৪৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৬ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। সারা বিশ্বের ন্যায় এই উপজেলাও করোনার থাবায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। তবুও জীবনের বেঁচে থাকার তাগিদে থেমে নেই কেউ। জীবনের মায়া ত্যাগ করে নানা পেশাজীবির মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই বেরিয়ে পড়ছেন কাজের সন্ধানে। এতে যেমন আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনিই পরিবার এবং অন্যজনকে আক্রান্ত করছেন বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। এদিকে, জীবননগর ইসলামী ব্যাংকের ১৩জন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২৬জন ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাস পজিটিভ হওয়ায় টনক নড়েছে প্রশাসনের।
অন্যদিকে, উপজেলার কেডিকে ইউনিয়নের কাশিপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত এক নারী স্বাস্থ্যকর্মীর দেহে করোনাভাইরাস (কোভিড ১৯) শনাক্ত হয়। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে টিকাপ্রাপ্ত অর্ধশত নারী ও শিশু। পর ওই স্বাস্থ্যকর্মীর সংস্পর্শে আসা টিকাপ্রাপ্ত ৪৯ জন নারীসহ উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জুলিয়েট পারউন, মেডিকেল অফিসার ডা. আফিন্দা আব্দুর রাজ্জাক, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, ৩ জন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, এমটি ইপিআই, ২ জন মেডিকেল টেকনিশিয়ান ল্যাব এবং সংস্পর্শে আসা আরও ১৫ জন কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীসহ মোট ৭৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করে জেলা সিভিল সার্জন অফিস। এর মধ্যে ৩ জনের ফলাফল পজিটিভ এবং বাকিগুলো নেগেটিভ আসে। শরীরে করোনা উপস্থিতি টের পেয়েও স্বাস্থ্যকর্মীর টিকা প্রদান করার বিষয়টি নিয়ে এলাকার সচেতন মহলের মনে সৃষ্টি হয় নানা প্রশ্ন। দেখা দেয় হতাশা। এখনো উপজেলার ২০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ওষুধ বিতরণ, স্বাস্থ্যবিধি মানতে পরামর্শ, ইপিআই কার্যক্রম, পরিবার পরিকল্পনা সেবাসহ সব ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সুরক্ষা-সামগ্রী ছাড়াই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেবা পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা।
এদিকে, সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের সোলায়মান নামের একজন কর্মচারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর প্রায় প্রতিদিনই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড জীবননগর শাখায় কর্মরত ১১ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং একজনের মৃত্যুর ঘটনায় ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড জীবননগর শাখা লকডাউন করে উপজেলা প্রশাসন। হঠাৎ করে ব্যাংক লকডাউন ঘোষণা করায় ২৫ হাজার গ্রাহককে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কারণ তাঁরা টাকা উত্তোলন ও নগদ জমা প্রদান করতে পারছে না। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা। শাখা ম্যানেজার বলছেন, এখন আমাদের কিছু করার নেই। স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কর্যক্রম বন্ধ থাকবে।
জীবননগরের করোনা পরিস্থিতি:
জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এ পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৩৫৬টি। প্রাপ্ত ফলাফল সংখ্যা ৩৪৫টি। ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫ জন, সুস্থ হয়েছেন ১০ জন এবং হোম আইসোলেশনে আছেন ১৪ জন। এই পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে ৫ জনকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে আছেন ২ জন। পরীক্ষার জন্য নতুন আরও ১১টি নমুনা সংগ্রহ করে কুষ্টিয়ার পিসিআর ল্যাবে নমুনা প্রেরণ করা হয়েছে। জীবননগর নমুনা পরীক্ষার শতকরা ৯ ভাগ করোনা শনাক্ত হচ্ছে। উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নে এ পর্যন্ত মোট ২৬ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। পৌরসভার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মজিবার রহমান ও ইসলামী ব্যাংক শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১ জনসহ পৌরসভায় ১৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। মনোহরপুর ইউনিয়নের ধোপাখালী মাঠ পাড়ায় ১ জন পুরুষ ও মনোহরপুর গ্রামের ১ জন গৃহবধূর দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। কেডিকে ইউনিয়নের খয়েরহুদা গ্রামে কাশিপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হলে তাঁর প্রতিবেশী এবং খয়েরহুদা গ্রামের মন্ডলপাড়ায় ৯ বছের শিশুকন্যাসহ আরও ২ জন নারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের পাক্কা বাজদিয়াই ও কুলতলায় ৩ জন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের এক নারীকে সংকটপন্ন অবস্থায় ঢাকা রেফার্ড করা হয় এবং কয়েকদিন আগে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংক জীবননগর শাখার ম্যানেজার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকের শাখায় ৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। ১৯ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বাকিদের পরীক্ষা করানো হবে। ১১ জন আক্রান্ত রোগী হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আর একজন মারা গেছেন। নমুনা দিয়ে করোনা পজিটিভ হওয়া তিনজন বাড়ি চলে গিয়েছেন। তাঁদের জীবননগর ছেড়ে যাওয়াটা উচিত হয়নি বলেও মনে করেন এ কর্মকর্তা। তাঁরা অন্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে, তাই তাঁদের সবাইকে গ্রামের বাড়িতে হোম আইসোলেশনে থাকার জন্য বলা হয়েছে। স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ থাকবে বলেন জানান তিনি।’
জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জুলিয়েট পারউইন বলেন, ‘ব্যাংকের ১৩ জন সদস্য হাসপাতালে নমুনা দেন। তাঁদের প্রত্যেককে বলা হয়েছে রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে। কিন্তু ৩ জন সদস্য বাড়ি চলে গেছেন। এ বিষয়টি দুঃখজনক। এর আগেও নৈশপ্রহরীর মৃত্যুর পর ব্যাংকের অন্যান্য সদস্যদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তখন তাঁদের অফিস না করার জন্য বলা হয়। বারণ করা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে দুজন অফিস করেন এবং রিপোর্টে তাঁরা দুজনও আক্রান্ত হন। জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স করোনা মোকাবিলায় সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং হোম আইসোলেশনে থাকা কোভিট পজিটিভ রোগীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মেডিকেল টিমসহ কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে।’
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুনিম লিংকন জানান, ‘করোনা আক্রান্ত ব্যাংক সদস্যরা যে বাড়িতে থাকতে, তা লকডাউন করা হয়েছে। রেড জোন ঘোষণার ব্যাপারে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি সিদ্ধান্ত মোতাবেক এলাকা রেড জোন হিসেবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বসবাসের এলাকা ভিত্তিক কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এলজিএসপি প্রোজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হতে এবং সঠিকভাবে মাস্ক পরার আহবান জানান তিনি।’
কমেন্ট বক্স