বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

দাদা তপনের ক্রসফায়ারে মৃত্যুর এক যুগপূর্তি আজ

  • আপলোড তারিখঃ ১৮-০৬-২০২০ ইং
দাদা তপনের ক্রসফায়ারে মৃত্যুর এক যুগপূর্তি আজ
ঝিনাইদহ অফিস: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক জনযুদ্ধ নেতা দাদা তপনকে এখনও হয়ত অনেকেরই মনে আছে। র‌্যাবের ক্রসফায়ারে সেই দাদা তপনের মৃত্যুর এক যুগ পূর্ণ হলো আজ। চরমপন্থী নেতা ঝিনাইদহে অনেকেই ছিলেন। কিন্তু যার নাম শুনলে গা ছম ছম করত, শরীরের রক্ত হিমশিতল হয়ে যেত, স্বয়ং চোখে দেখলে মুহূর্তেই থেমে যেত হৃদস্পন্দন। নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন জনযুদ্ধের প্রতিষ্ঠাতা সেই আব্দুর রশিদ ওরফে দাদা তপন ২০০৮ সালের এই দিনে (১৮ জুন) র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। নৃশংস খুনের জন্য দেশ-বিদেশে সাড়া জাগানো দাদা তপনের নিথর দেহ পড়ে ছিল কুষ্টিয়া সদরের বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামে। ওই বাড়িটি তাঁর নিজের ছিল। এ সময় রিক্তা নামের এক নারীও নিহত হন দাদা তপনের সঙ্গে। এক সময়ের মাদ্রাসার ছাত্র ও মসজিদের খণ্ডকালীন ইমাম দাদা তপন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের পশ্চিম বিষয়খালী গ্রামের ইবাদত হোসেন মালিথার ছেলে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট ও তথ্য নিয়ে জানা গেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী দলে দাদা তপনের উত্থান ছিল চমকে ভরা। মানুষ খুনের পাশাপাশি চাঁদাবাজির জন্য ঝিনাইদহসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে নির্বিচারে বোমাবাজির অনুঘটক ছিলেন তিনি। তাঁর নিশানা থেকে বাঁচার কোনো পথ ছিল না। পুলিশের কাছ থেকেও তিনি কয়েকবার পালিয়েছেন। জেলাব্যাপী নৃশংসভাবে গলাকেটে একের পর এক যখন খুন আর রক্তের হোলি খেলায় মত্ত তপন, তখন অনেকটাই খেয় হারিয়ে ফেলে পুলিশ বাহিনী। গোয়েন্দা তথ্য ভুল প্রমাণিত করে একের পর এক হত্যাযজ্ঞ ও বোমাবাজি চালায় খোদ ঝিনাইদহ শহরেই। শুধু ঝিনাইদহ নয়, দ্রুত তাঁর নিষিদ্ধ সংগঠন খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চালান খুনের বিভীষিকা। গ্রামের অধিকার বঞ্চিত, অভাবী ও বিচারবঞ্চিত নিম্ন পরিবারের যুবকেরা প্রতিশোধ নিতে নাম লেখায় জনযুদ্ধে। মাঠে-ময়দানে পড়ে থাকে ছিন্নভিন্ন মানুষের লাশ। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই লোমহর্ষক খুনের চিত্র চোখে পড়ে। খুনের পর ফোনে এবং ফ্যাক্স করে হত্যার দায় স্বীকার করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিত তপন বাহিনী। এভাবে টালমাটাল পরিস্থিতি চলার পর সদর উপজেলার ১৮ মাইল নামক স্থান থেকে ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়ার সুমন নামে এক যুবক র‌্যাবের জালে ধরা পড়ে। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হয় ১৭টি মোবাইল সিম। খোঁজ মেলে দাদা তপনের ডেরার। নিখুঁত ছক আর নিশানায় র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-৬ কুষ্টিয়া সদরের বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামে অভিযান চালায়। দিনের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। প্রাচীর টপকে র‌্যাবের চৌকস দল প্রবেশ করে বাড়ির ভেতরে। সঙ্গে র‌্যাব-১২ কুষ্টিয়া ইউনিটের ইনচার্জ মেজর আমজাদ হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। সফলভাবে শেষ হয় অপারেশন। শেষ হয় দাদা তপন অধ্যায়। নিহত তপনের পাশে তখনও পড়ে ছিল তাঁর প্রিয় এ কে-৪৭ রাইফেলটি। দাদা তপন নিহত হওয়ার পর তাঁর আইটি দপ্তরের প্রধান ছোট ভাই আকাশ, টিক্কা ও একদিল বন্দুকযদ্ধে নিহত হন। খুন করার পর দাদা তপনের ছোট ভাই আকাশ ফ্যাক্স বার্তায় হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিতেন। মুকুটহীন সম্রাটের মতোই দাদা তপন আন্ডার ওয়ার্ডে ছড়িয়ে দেন বিভীষিকা। তাঁর আগ্রাসী তৎপরতায় পূর্ববাংলার অপর গ্রুপ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন, গণমুক্তিফৌজ, কৃষক সংগ্রাম সমিতি, জাসদ গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টিসহ গোপন এবং প্রকাশ্য সংগঠনগুলো কোনঠাসা হয়ে পড়ে। ঝিনাইদহের অনেক বড় বড় নেতা ও ঠিকাদারকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো দাদা তপনের। তপনের কথা হেরফের হলেও বোমার ঝাঁক গিয়ে পড়ত নেতাদের বাড়িতে অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ৯০-এর দশকের শুরুতে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আবির্ভাব ঘটে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া গ্রামের দর্জি টিপু মুকুটহীন সম্রাট হন। এই দলের দাপটে বাঘে-ছাগলে একঘাটে পানি খায়। টিপু সঙ্গী হিসেবে পায় চরমপন্থী ইছাকে। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ইছা। দলীয় ক্যাডাররা বিশ্বাসঘাতকতা করে টিপু ও তাঁর ৩ সঙ্গীকে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার এক বিলের মধ্যে জীবন্ত কবর দেন। শেষ হয় টিপু অধ্যায়। বিবিসির খবরে টিপুর নাম উল্লেখ করে বুলেটিন প্রচারিত হয়। এভাবে ক্ষমতার পালা বদলে আন্ডার ওয়ার্ড অশান্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯৭ সালের দিকে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে ঝিনাইদহের মীর ইলিয়াস হোসেন দিলিপের নেতৃত্বে গঠন করা হয় শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন। দলের সামরিক শাখার নাম দেওয়া হয় গণমুক্তি ফৌজ। বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির বেশিরভাগ নেতা বা ক্যাডার গণমুক্তিফৌজে যোগ দেয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম ১৯৯৯ সালে সাধারণ ক্ষমার সুযোগ দেয়। শুরু হয় আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া। এ সময় বিপ্লবী ও পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি আত্মসমর্পণে সাড়া দেয়নি। ২০০০ সালের ১৫ জানুয়ারি শহরের পাগলাকানাই মোড়ে গুলিতে সঙ্গী আলফাজসহ নিহত হন মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ। ২০০০ সালের দিকে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে গঠিত হয় (এমএল লাল পতাকা), (এমএল জনযুদ্ধ) ও (এমএল যোদ্ধা) এই ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সামরিক শক্তি এবং হত্যা কৌশলের দিক থেকে আবদুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপনের নেতৃত্বাধীন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল জনযুদ্ধ) শীর্ষে চলে যায়। বিচার না করে গ্রাম-শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষকে হত্যার নিশানা বানিয়ে দাদা তপন সবার কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাড়ায়। এদিকে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ‘আমি আবির হাসান বলছি’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে মিরপুর উপজেলার মালিহাট গ্রামের নছর হত্যার দায় স্বীকার করে আতঙ্কেরও সৃষ্টি করে সেসময়। সিরাজ, লাল্টু, ঠাণ্ডুসহ অনেকই সে সময় একেকজন আতঙ্কের নাম ছিল। দাদা তপনের আগে দেশে সবচেয়ে সাড়া জাগানো ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ছিল সিলেটের বুনিয়াদি পরিবারের সন্তান কমরেড মোফাখখার চৌধুরী। তিনি ছিলেন গোপন রাজনৈতিক দল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন শীর্ষ নেতা। সাহিত্যিক ও লেখক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি ছিল। ২০০৫ সালে ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরবর্তীতে র‌্যাবের তরফ থেকে জানানো হয় যে মি. চৌধুরী ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। মোফাখখার চৌধুরী নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু বৃদ্ধিজীবী। ২০০৮ সালে পুলিশের সঙ্গে আরেকটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হন নিষিদ্ধ সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল লাল পতাকা) শীর্ষ নেতা কোটচাঁদপুরের ডা. মিজানুর রহমান টুটুল ওরফে রাকেশ কামাল। এমবিবিএস চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান টুটুল আটক হবার পর তাঁর মা নভেরা খাতুন ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আকুতি জানিয়েছিলেন যে তাঁর ছেলেকে যেন ‘ক্রসফায়ারে মারা না হয়’। তবে ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে জনযুদ্ধের দাদা তপনই এক মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন, যা এখনকার প্রজন্মের কাছে রুপকথার গল্পের মতো।


কমেন্ট বক্স
notebook

ফুফুর টাকা হাতিয়ে নিতে ভাতিজার ‘ছিনতাই নাটক’