
সরকারের সাহসী চিন্তার ফসল বাজেট : আ.লীগ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, করোনা মহামারি থেকে সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার গতিপথ নির্ণয়ে প্রণীত এবারের বাজেট। জীবন-জীবিকার ভারসাম্য বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা সরকারের সাহসী চিন্তার ফসল এ বাজেট। বিএনপির পক্ষে এই বাজেটের ব্যাপকতা ও সম্ভাবনা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। গতকাল প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের উপর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। সংসদ ভবনের তার সরকারি বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। দলীয় কার্যালয়ে শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ৃয়া এবং উপ-দফতর সম্পাদক সায়েম খান প্রমুখ। বাজেট প্রণয়নের দু’টি অনিশ্চয়তার দিক তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এই বাজেট প্রণয়নে দু’টি অনিশ্চয়তা ছিল, যা জয় করা ছিল দুরূহ। অনিশ্চয়তা দু’টি হচ্ছে- বাংলাদেশে করোনা মহামারি চূড়ান্ত পর্যায়ে কী হবে, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো স্বচ্ছ ধারণা না থাকা এবং করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি কী হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে এখনই বলতে না পারা। এই অনিশ্চয়তা জয় করে দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলার একমাত্র ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত সফলভাবে বাজেট প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করেছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে কয়েক মাস ধরে বিপর্যয়ের পরও আমাদের বাজেটের আকার কমেনি, বরং বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১১ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিক অগ্রগতির সুফল এই বাজেট। তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, মানুষ যেন কষ্ট না পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সব প্রতিকূলতা জয় করে জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের এ বাজেট উত্থাপন করা হয়। এ বাজেট করোনায় বিদ্যমান সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার বাস্তবসম্মত প্রত্যাশার দলিল।
বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে করোনার কবল থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের এক ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট হচ্ছে এবারের বাজেট। এটি একটি জনবান্ধব ও জনঘনিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। বিএনপির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের বলেন, বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কোনো ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ না করেই বিএনপি আগেভাগে প্রস্তুত করা ও মন গড়া, পুরনো ও গতানুগতিক গল্পের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বিএনপির নেতারা গত ১১টি বাজেট ঘোষণার পর বাজেট নিয়ে নানা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন এবং বরাবরই বলেছেন বাজেট বাস্তবায়ন হবে না, অর্থনীতি মুখড়ে পড়বে। এ ধরনের বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করতে দেখা গেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, গতানুগতিক ধারার সঙ্গে ‘আউট অব বক্স’ চিন্তার সমন্বয় করে সংকট জয়ের নবউদ্যোম সৃষ্টিতে এই বাজেট পেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাসের প্রকোপে বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতিতে ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথপরিক্রমা’ শীর্ষক যুগোপযোগী ও জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

গতানুগতিক, সৃজনশীলতা নেই
সমীকরণ প্রতিবেদন:
আগামী অর্থবছরের (২০২০-২১) জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে গতানুগতিক বলেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন বাজেটে নতুন উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা দেখা যায়নি। অন্যদিকে সরকার রাজস্ব আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনীতির কিছু সূচকের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে তা বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। বাজেট ঘোষণার পরদিন গতকাল এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির মূল্যায়নে এমন মতামত এসেছে। সিপিডির পর্যালোচনায় স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষিসহ সরকারের অগ্রাধিকার দেয়াকে বাজেটের ইতিবাচক দিক বলা হয়েছে। ব্যক্তি করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রশংসা করা হয়েছে। তবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাড়িয়ে সৎ করদাতাদের আরও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বলে সংস্থাটি মনে করছে। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর লিখিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। উপস্থাপনা শেষে তার সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন সংস্থার ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং ঊর্ধ্বতন গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সঙ্কটের এই সময়ে বাজেটে আরও সৃজনশীলতা দরকার ছিল। সরকারের লক্ষ্যমাত্রাগুলো বাস্তবতার মধ্যে থাকা উচিত ছিল। বাংলাদেশ ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে বড় উল্লম্ফন হতে যাচ্ছে- এ ধরনের অনুমান আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও ভুল বার্তা দেবে। এটি করোনা মোকাবিলায় তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমরা সব সময়ই বলে আসছি বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক যে কোনো নীতি গ্রহণে প্রবৃদ্ধি কী হবে তা ভাবা উচিত হবে না। বরং দেশের মানুষের জীবন রক্ষা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কষ্ট লাঘবই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। অথচ এ বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীক মনোভাব থেকে বের হতে পারেনি সরকার। ড. ফাহমিদা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে, শিক্ষা কৃষি ও কর্মসংস্থান খাত প্রথম দিকে আসেনি। তালিকার দিকে যেটি বরাদ্দ দেয়ার কথা সেটি দেখছি না। তিনি বলেন, করমুক্ত আয়সীমায় পরিবর্তন করা হয়েছে। করোনার প্রেক্ষিতে এটি ভালো উদ্যোগ। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও ২৪ দশমিক ৩৭ শতাংশই বাড়ানো হয়েছে অনুন্নয়ন খাতে। মাত্র ১ দশমিক ৯০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে উন্নয়ন খাতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনও স্বাস্থ্যখাতের মোট বরাদ্দ দেশের জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। অথচ ৩০টিরও বেশি স্বল্পোন্নত দেশের স্বাস্থ্যখাতের ব্যয় তাদের জিডিপির ১ শতাংশের চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, আশ্চর্যজনকভাবে করোনাভাইরাসও সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে স্বাস্থ্যখাতকে বিবেচনা করাতে পারেনি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বেড়েছে তবে অন্য বছরের চেয়ে কম। কর্মসংস্থানে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যখাত, কর্মসংস্থান ও কৃষিখাতকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বললেও বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সঙ্কটের সময় সুশাসনের অভাব দেখা গেছে। বাজেটে যত সূচক দিয়েছে সেটি বাস্তবের আলোকে দরকার ছিল। অর্থনীতি চিত্র সঠিকভাবে না দেয়ায় আন্তর্জাতিক মহলও প্রশ্ন তুলবে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বিশ্বে কমেছে সেটি বিবেচনা করে রেমিট্যান্স প্রবাহের দিকে নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি দায় দেনার ক্ষেত্রে ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ঋণ। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতির যে পর্যবেক্ষণ সেখানে দেখা গেছে ২০২০-২১ অর্থবছরের যে সামস্টিক অর্থনীতির যে কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কারণ বাজেটের রিকভারির যে পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার মনে করছে কোভিড আক্রান্তের সময়কাল থেকে আমাদের রিকভারিটা আগামী একবছরের মধ্যে করতে পারবে। কিন্তু পৃথিবীর বহু দেশে এটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই অনুমতিটা কতোটা বাস্তবোচিত হয়েছে সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে।
রাজস্ব আহরণের বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আগের অর্থবছরের বাজেটের মতোই রাজস্ব আহরনের বিরাট একটি লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। ড. ফাহমিদা বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ঊল্লম্ফন। এটি বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ। ৫০ শতাংশ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে এনবিআরের রাজস্ব বহির্ভূতখাতগুলো থেকে আরও রাজস্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব বিভাগের যে ধরনের জনশক্তি, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, নীতিমালাসহ অন্য পদক্ষেপ দরকার সেগুলো এখন পর্যন্ত নয়। ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবছর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয় এবং একটা ডিসকাউন্ট রেটে। ১০ শতাংশ কর দিয়েই কালো টাকা সাদা করা যায়। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে। সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে দায়বদ্ধতার আন্তরিকতা আছে, কিন্তু উদ্ভাবনের দিকটা নেই। গতানুগতিকতার আশ্রয় নিয়ে হিসাব মেলানো হয়েছে। করোনা দুর্যোগ দ্রুত কেটে যাবে বলে অনুমান করা হয়েছে। দেশ বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে আছে এবং যেসব দুর্বলতা এখন দেখা যাচ্ছে সেই জায়গায় আরও প্রাধিকার দেয়া উচিত ছিল। করোনাভাইরাসের কারণে বিদেশে সমানে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, ইউরোপের দেশগুলোতে মানুষ ভোগ ও ব্যয় কমাচ্ছে। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে এই রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে সেটিও বর্তমানের পরিস্থিতি বিবেচনায় সম্ভব নয়। অথচ উচ্চধনীদের আয়কর কমানোর মাধ্যমে সরকার একদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, অন্যদিকে বৈষম্য বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অবাস্তবায়নযোগ্য : বিএনপি
সমীকরণ প্রতিবেদন:
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অবাস্তবায়নযোগ্য, গতানুগতিক এবং সাধারণ বাজেট হিসেবে আখ্যা দিয়েছে বিএনপি। এই বাজেট জাতিকে হতাশ করেছে মন্তব্য করে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, করোনা মহাসঙ্কট থেকে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে উদ্ধারের জন্য প্রয়োজন ছিল প্রথাগত, গতানুগতিক বাজেট কাঠামো থেকে বেরিয়ে ‘বিশেষ করোনা বাজেট’ ঘোষণা। সেটি না করে অর্থমন্ত্রী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার একটি গতানুগতিক, অবাস্তবায়নযোগ্য বাজেট ঘোষণা করেছেন। গতকাল শুক্রবার বাজেট নিয়ে ভার্চুয়াল কনফারেন্সে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, গত ৯ জুন বিএনপির পক্ষে আমরা সুনির্দিষ্ট পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সমৃদ্ধ তিন বছরের একটি মধ্যমেয়াদি বাজেট রূপরেখা দিয়েছিলাম। অর্থমন্ত্রী আমাদের সুপারিশ ও দেশের অধিকাংশ শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের অভিমতকে উপেক্ষা করে প্রত্যাশিত ‘অসাধারণ বাজেটের’ স্থলে নিতান্তই একটি ‘সাধারণ বাজেট’ ঘোষণা দিলেন। তিনি বলেন, এই বাজেটে করোনা কাটিয়ে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নেই। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে প্রত্যাশিত অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। বাজেটে বর্তমানে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কার্যকর সুশাসন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বস্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জাতি আশা করেছিল এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেন। এছাড়া করোনা মোকাবেলায় ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হলো জিডিপির মাত্র ১.৩% মাত্র। অথচ স্বাস্থ্য খাতে আমরা জিডিপির ৫% বরাদ্দের প্রস্তাব করেছিলাম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এর চেয়ে অধিক অর্থ অ্যাবর্জর্ব করতে পারবে না এমন খোঁড়া যুক্তিতে স্বাস্থ্য খাতে অধিক বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বরাদ্দ যাই হোক না কেন প্রয়োজন স্বচ্ছ দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার। সে বিষয়ে বাজেটে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রকৃত অর্থে কোনো গঠনমূলক ব্যবস্থা কিংবা সংস্কার প্রস্তাবও নেয়া হয়নি। এমনকি যেসব প্রকল্প নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে সেসব প্রকল্পগুলোকেই সরকারের বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ পরিবহন খাত ও বিদ্যুৎ খাতসহ এমন অনেক খাতে অনেক বেশি পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যা এ মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল না। সরকারি ভাষ্য মতে, বর্তমানে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ২০ হাজার ২৭৯ মেগাওয়াট। তাই এ অসময়ে তোড়জোড় করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দের কোনো দরকার ছিল না। ১২০০ মেগাওয়াট রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকায় দেশের সবচেয়ে একক ব্যয়বহুল চাপযুক্ত জল-চুক্তি প্রকল্প যা রাশিয়ান এক কোম্পানি বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দিয়ে ঐ অর্থ স্বাস্থ্য খাতসহ কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা যেত।
অর্থনীতির এই সাবেক ছাত্র ও শিক্ষক বলেন, বাজেটের আয় ও ব্যয়ের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাজেটে কেবল ‘সংখ্যার’ হিসাব মিলানো হয়েছে। বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১ কোটি টাকা। এনবিআরকেই আয় করতে হবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা বাস্তবতা বিবর্জিত। ব্যাংকগুলোর পক্ষে প্রস্তাবিত ডিফিসিট ফিন্যান্সিং এর ৮৫ হাজার কোটি টাকা যোগান দেয় সম্ভব হবে না। এনবিআর এর পক্ষে এত বিপুল রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা ও বাংকগুলোর পক্ষে ঘাটতি অর্থায়নে অক্ষমতার কারণে বাজেট মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। তিনি বলেন, বাজেটে ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের কোনো সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব নেই। বরং শীর্ষ ঋণ খেলাপিদের ঋণ পরিশোধে আরও সময় বৃদ্ধি করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটা তো কোনো সংস্কার নয়। যা ব্যাংকিং খাতকে আরো সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। আর্থিক শৃঙ্খলা আরো ভেঙে পড়বে। তিনি আরও বলেন, অর্থমন্ত্রী এ বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করেছেন ৮.২%। আমদানি, রফতানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ম্যাক্রো ইকোনমিক ইনডিকেটরগুলো আলোচনা করলেই স্পষ্ট যে ৮.২% প্রবৃদ্ধি অর্জন নিতান্তই কল্পনাপ্রসূত। বিনিয়োগ দরকার ৩২-৩৪ শতাংশ, যা কঠিন এবং অসম্ভব। জিডিপি ও রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা দৃশ্যমানভাবেই প্রতারণার শামিল।