আসন্ন ঈদ উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গায় খুলেছে মার্কেট-বিপনীবিতান, প্রথম দিনেই উপচে পড়া ভিড়
মেহেরাব্বিন সানভী:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রায় দেড় মাস বন্ধ থাকার পর ঈদ উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গা শহরের মার্কেটগুলো খুলেছে। সীমিত পরিসরে মার্কেট চালুর কথা থাকলেও কেউই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছেন না। বিপণীবিতানগুলোতে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। গতকাল রোববার সকাল ১০টা থেকেই চুয়াডাঙ্গা সমবায় নিউ মার্কেট, প্রিন্স প্লাজা, আব্দুল্লাহ সিটি, বড় বাজার, বড় গলি, মুন সুপার মার্কেট, আলী হোসেন মার্কেট, মালিক টাওয়ার, ফাতেমা প্লাজাসহ প্রায় সব মার্কেট খুলতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কেটগুলোতে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। ধীরে ধীরে মার্কেটে ক্রেতাদের ঢল নামতে শুরু করে। বিশেষ করে পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের বেশি উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে, রোডে মানুষের ঢল নামার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বা স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করতে দেখা গেছে অহরহ। চিহ্ন দিয়ে কিছু কিছু দোকানিরা দূরত্ব রক্ষার অনুরোধ করলেও অধিক মানুষ থাকায় তাঁদের উদ্দেশে ভেস্তে যায়। সকাল থেকে একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে মাইকিং করে সরকারি নির্দেশনা মানার নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তবে নিয়ম মেনে বিকেল চারটায় দোকানপাট বন্ধ করেছে ব্যবসায়ীরা। মার্কেট ব্যবসায়ী নেতৃত্ববৃন্দকে ৪টা বাজার কিছুটা আগে থেকেই হ্যান্ড মাইকে সর্তকবার্তা দিতেও দেখা গেছে।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা সমবায় নিউ মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, চালু হওয়া বিপণীবিতানগুলোতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দোকানি ও কর্মচারীরা ক্রেতাদের পণ্য দেখাচ্ছেন। নিয়ম-নীতি না মেনে মার্কেটের প্রবেশপথ দিয়ে গাদাগাদি করে ঢুকছেন ক্রেতারা। নিরাপদ দূরত্ব বজায় তো দূরের কথা, অনেকের মুখে নেই মাস্কও। নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কেটের গেটে নামমাত্র হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই কারো। সবমিলিয়ে পুরো সময়টাতেই প্রচুর মানুষের ভিড় ছিল মার্কেটে। মাঝে মাঝে পুলিশ, সেনাবাহিনী বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এলে কিছুটা দূরত্ব মানলেও পরক্ষণেই তা আবার হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
প্রিন্স প্লাজায় দেখা গেছে, ক্রেতারা অনেকেই মাস্ক পরিধান ছাড়াই ঘোরাফেরা ও কেনাকাটা করছেন। মার্কেটের অনেক দোকানি ও কর্মচারীও মাস্ক না পরেই জিনিসপত্র বিক্রি করছেন। মার্কেটের সামনে বা কোথায় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল না। আব্দুল্লাহ সিটিতেও প্রবেশপথে হাত ধোঁয়ার কোনো ব্যবস্থায় ছিল না। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে অনেকটা গাদাগাদি করেই কেনাবেচা করা হচ্ছে। আলী হোসেন সুপার মার্কেটে ঢোকার আর বের হওয়ার ঠিক নেই। প্রচুর মানুষ একসঙ্গে ইলেক্ট্রনিক্সসহ নানা প্রকার জিনিসপত্র কিনছেন। কোনো দোকানের সামনেই নির্দেশনা অনুযায়ী মার্ক করা ছিল না। তবে বিকেলে চারটার পরও কয়েকটা দোকান এ মার্কেটে খোলা পাওয়া গেছে। একই রকম অবস্থা দেখা গেছে শহরের প্রায় প্রত্যেকটা মার্কেটে। তবে সব থেকে খারাপ অবস্থা ছিল বড় বাজার গলির ভেতরের দোকানগুলোতে। দাঁড়াবার মতো জায়গা ছিল না। মানুষের এতো ভিড় যে, একজনকে একটি দোকান থেকে পাশের দোকানে যেতে হলে অন্তত ১০ জনকে ঠাসাঠাসি করে সরিয়ে যুদ্ধে জেতার মতো করে যেতে হবে।

আবীর আহমেদ নামের এক ক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ভেবেছিলাম মার্কেটে প্রথম দিনে লোকজন কম হবে, এ সুযোগে কিছু কেনাকাটা করব। কিন্তু মার্কেটে তিল ধারণের জায়গা নেই। অভিযোগ করে আরেক ক্রেতা ফাতেমা আশরাফ বলেন, বেশিরভাগ দোকানেই স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। হ্যান্ড ওয়াশ বা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা নেই। দোকানদারদের মুখে মাস্কও নেই, বিক্রেতারা হ্যান্ড গ্লাভসও ব্যবহার করছেন না। সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে চুয়াডাঙ্গার অবস্থা খারাপের দিকে যাবে।
মাস্ক পরে আসেননি কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাম হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘অনেকদিন পর দোকান খুলল। ভয় লাগলেও প্রথম দিনেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে মার্কেটে এসেছি। যাতে কিছুটা নিরাপদ থাকা যায়। তবে গ্লাভস না পরে এসে ভুল করেছি। চিন্তা করছি আজই সব কেনাকাটা শেষ করে ফিরব, যাতে আর মার্কেটে না আসতে হয়।’
অবশ্য ভালো চিত্রও দেখা গেছে কিছু কিছু বিপণীবিতানে। সমবায় নিউ মার্কেটের দ্বিতীয় তলার কয়েকটা দোকান যেমন নন্দন, আব্দুল্লাহ সিটির বন্ধু গার্মেন্টসসহ কয়েকটি দোকনে প্রবেশের আগেই কর্মীরা জীবাণুনাশক দিয়ে ক্রেতাদের হাত ও পা ভিজিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া দোকানগুলোতে কর্মীরা মাস্ক, গ্লাভস ও মাথায় টুপি পরে ক্রেতাদের সামনে পোশাক উপস্থাপন করছেন। আর পোশাকে হাত দেওয়ার আগে ক্রেতাদের হাতে আবারও জীবাণুনাশক দেওয়া হচ্ছে। দোকানের মালিকদের দাবি, দোকানিরা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তাঁরা মার্কেট বন্ধ করে দেবেন। আর এ উদ্যোগে ভয়হীনভাবে কেনাকটা করতে পেরে খুশি ক্রেতারাও।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘প্রচুর সংকটের মধ্যে আমাদের দিন যাচ্ছে। এ মুহূর্তে সরকার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা কিছুটা হলেও আমাদের সংকট কাটাতে সহায়তা করবে। সরকারের বিধিনিষেধ মেনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করেছি।’ সমবায় নিউ মার্কেটের নন্দনের সত্ত্বাধিকারী সুমন পারভেজ বলেন, ‘আমার দোকানে প্রবেশের ক্ষেত্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারসহ মাস্ক পরিধান ব্যতীত কোনো ক্রেতা প্রবেশ করতে পারবেন না। পাশাপাশি কর্মচারীরা সবাই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করছেন। সামাজিক ও শারীরিক দূরুত্ব মেনেই দোকানে বেচাকেনা করা হচ্ছে।’

জেলা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আসাদুল হোসেন জোয়ার্দ্দার লেমন বলেন, ‘মার্কেটের দোকান মালিকদের নিয়ে সভা করেছি। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলার আশ্বাস দিয়েছেন এবং সেই মতো কাজ করেছেন। সকালে দোকানে দোকানে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। যেখানে একাধিক কর্মী দিয়ে ক্রেতাদের হাতে ও পায়ে জীবাণুনাশক দেওয়া হচ্ছে। মাস্ক ছাড়া কোনো ক্রেতাকে মার্কেটে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারের সব নির্দেশনা মেনে মার্কেট চালু রাখতে চাই।
এদিকে, শহরের বর্তমান অবস্থা দেখে পিপিই পরে বাইরে বোরোনে এক সচেতন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে বলেন, ‘ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। শহরে যেরকম মানুষের ঢল। একজন আরেকজনের ঘাড়ের ওপর উঠে যাচ্ছে। সরকার জনগণকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। আর জনগণ সচেতন নয়; তারা আত্মহুতি দিতে প্রস্তুত। এর ফল জনগণ ও সরকারকেই নিতে হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, মার্কেট খোলা রাখার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী চলতে হবে। চুয়াডাঙ্গার ব্যবসায়ীরা মার্কেট চালু রাখতে আগ্রহী। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মার্কেট খোলা রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘আজ থেকে তাদেরকে আরও সতর্ক করা হবে। তা ছাড়া আজ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতে বাড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকবে। আমি নিজেও আজ তদারকি করব। পরিস্থিতি খারাপ হলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে সবোর্চ্চ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। প্রশাসনের নির্দেশনা অবশ্যই প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে পালন করতে হবে। এর ব্যতায় ঘটলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’