বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

যেভাবে সংক্রমণের রাশ টানলো সিঙ্গাপুর

  • আপলোড তারিখঃ ০৭-০৫-২০২০ ইং
যেভাবে সংক্রমণের রাশ টানলো সিঙ্গাপুর
নিজস্ব প্রতিবেদক: করোনার সংক্রমণ গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, তার উদাহরণ এখন সিঙ্গাপুর। করোনা মহামারি সিঙ্গাপুরকে কাবু করতে পারেনি। অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হলেও মানুষের প্রাণহানি রুখে দিতে পেরেছে বিশ্বের অন্যতম ধনী এ দেশটি। দু’দফা সংক্রমণের ধাক্কা কাটিয়ে সিঙ্গাপুর এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার দ্বারপ্রান্তে। প্রবাসী শ্রমিকের বাইরে সিঙ্গাপুরে এখন স্থানীয় সংক্রমণ হচ্ছে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ জন করে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে এ সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার কথা বলছে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ। অবশ্য শ্রমিকদের ডরমেটরিতে সংক্রমণ এখনও ধরা পড়ছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম। যাদের বিমানবন্দর করোনা মহামারির মধ্যে এক দিনের জন্য বন্ধ করা হয়নি। দেশে অবরুদ্ধ অবস্থা তৈরিতে লকডাউন নয়, প্রবর্তন করা হয়েছে সার্কিট ব্রেকার। অর্থাৎ একসঙ্গে দু’জন মানুষ চললেও সার্কিট ব্রেকারের মতো জুটি ভেঙে দূরত্ব রেখে চলতে হবে। সিঙ্গাপুরের করোনা জয়ের আদ্যোপান্ত জানান সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুরের (বিডিচ্যাম) সাবেক সভাপতি সাহিদুজ্জামান টরিক। তিনি বলন, সিঙ্গাপুরে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে জানুয়ারির শেষে। শুরুতে সংক্রমণ ছড়ায় মূলত প্রবাসী শ্রমিকদের ডরমেটরিতে। পরে স্থানীয়দের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা দিতে শুরু করে। প্রথম দফা সংক্রমিত বেশ কয়েকজন হাসপাতালেও ভর্তি হন। কিন্তু কারও মৃত্যু হয়নি। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝিতে সার্কিট ব্রেকার শিথিল করায় দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ শুরু হয়। অনেকটা দাবানলের মতোই দ্রুতগতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এক মাস না যেতেই আক্রান্তের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজারের ঘরে। হাসপাতালে ভর্তি হন দেড় হাজার। তবে সিঙ্গাপুরে মৃত্যুর হার খুবই কম। এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে মাত্র ১৭ জনের। সাহিদুজ্জামান টরিক বলেন, প্রথম দফার সংক্রমণ যখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত, তখন ৬ এপ্রিল হঠাৎ করেই কয়েকজন প্রবাসী শ্রমিক আক্রান্তের খবর আসে। তারা সংক্রমিত হন জনপ্রিয় শপিং মল মোস্তফা সেন্টারের আশপাশ থেকে। নতুন করে সংক্রমণের খবরে নড়েচড়ে বসে সিঙ্গাপুর সরকার। দ্রুততম সময়ে সার্কিট ব্রেকার আরও কঠোর করা হয়। সাহিদুজ্জামান টরিক আরো বলেন, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছুই শেখার আছে। এর মধ্যে দুটো বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হচ্ছে আইসোলেশন এবং অপরটি দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। এখানে আক্রান্তদের কাছ থেকে সুস্থ শ্রমিকদের আইসোলেশন বা পৃথক করা হয় অভূতপূর্ব দ্রুতগতিতে। জুরং এলাকার দুটো ডরমেটরির সব শ্রমিককে ভেতরে থাকতে বলা হয়। সেখানে প্রবেশ করেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। প্রত্যেকের টেস্ট করা হয়। এরপর আক্রান্তদের পৃথক করে সুস্থদের নিয়ে যাওয়া হয় সমুদ্রে ভাসমান বিলাসবহুল জেমিনি ক্রুজে। ভাসমান এ জাহাজে ৫ হাজার কক্ষ রয়েছে। এছাড়া দ্রুতগতিতে আইসোলেশন কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুর এক্সপো সেন্টারকে প্রস্তুত করা হয়। সেখানে ২০ হাজার রোগী রাখার ব্যবস্থা আছে। প্রস্তুত রাখা হয় সিঙ্গাপুরের গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের আরও ২০ হাজার ফ্ল্যাট। শুধু পৃথক করেই দায়িত্ব শেষ করেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। আইসোলেশনে থাকা শ্রমিকদের জন্য অভূতপূর্ব সব ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রত্যেক শ্রমিক মোবাইলে টকটাইম থেকে শুরু করে বাড়িতে টাকা পাঠানোর সবই করতে পারছেন এক জায়গায় থেকে। সিনেমা দেখা থেকে শুরু করে সব বিনোদনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। করোনার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। ৪ এপ্রিল সরকার ঘোষণা করেছে- হাসপাতালগুলোতে সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা যে চিকিৎসা পাবেন, প্রবাসী শ্রমিকরাও তাই পাবেন। সাহিদুজ্জামান টরিক আরো জানান, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সিঙ্গাপুরের সব হাসপাতাল পুরোপুরি সচল। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত একজন চিকিৎসা কর্মীও আক্রান্ত হননি। চিকিৎসকরা রোগীদের অপেক্ষায় বসে থাকছেন। সার্কিট ব্রেকারের মধ্যেও সিঙ্গাপুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ও রেস্টুরেন্ট খোলা। পরিবারের একজন সদস্য সপ্তাহে এক বা দু’দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাড়ির বাইরে যেতে পারবেন। তবে কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। দোকানের জায়গা অনুপাতে দূরত্ব বজায় রেখে নির্দিষ্ট ক্রেতা ঢোকার পর প্রধান ফটক বন্ধ করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ঢোকার সুযোগ পান অন্যরা। বাইরে গেলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। দোকানে আইডি কার্ড স্ক্যান করে রাখা হচ্ছে। যাতে একই ব্যক্তি একাধিকবার দোকানে আসতে না পারেন। রাস্তায় নামলেই তল্লাশির মুখে পড়তে হয় নাগরিকদের। এছাড়া করোনা মোকাবেলায় হাজার হাজার সেচ্ছাসেবককে মাঠে নামানো হয়েছে। কারণ সিঙ্গাপুরে প্রাপ্তবয়স্ক হলেই বাধ্যতামূলক সেনা প্রশিক্ষণ নিতে হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ নাগরিকরাই এখন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া করোনা থেকে সেরে ওঠা শ্রমিকদের শতভাগ নিরাপদ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই তাদের সেনা ডরমিটরিতে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগানো হচ্ছে। জরুরি খাবার তৈরি করছে ইনফ্লাইট ক্যাটারিং সার্ভিসের কর্মীরা। প্রতিদিন ১০ লাখ মানুষের খাবার তৈরি করে বিতরণ করা হচ্ছে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে ইতোমধ্যে ৬শ’ ডলার করে ভাতা দেয়া হয়েছে। যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের অনলাইনে চাকরির আবেদন করতে বলেছে সরকার। সাহিদুজ্জামান টরিক বলছেন, নানামুখী ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ার কারণে সিঙ্গাপুরের স্থানীয় নাগরিক সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা মাত্র ১ হাজার। কিন্তু শ্রমিকদের ডরমেটরিতে সংক্রমণ ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে সেখানেও এখন সংক্রমণ দ্রুতগতিতে নামছে। রোববার এ সংখ্যা ছিল ৬৫৭ জন। অথচ এপ্রিলের মাঝামাঝি নাগাদ ডরমেটরিতে প্রতিদিন সংক্রমণের হার ছিল ১ হাজারের উপরে। গত ১০ দিন ধরে এ হার ক্রমেই কমছে। যারা সংক্রমিত হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের সফল কন্ট্র্যাক্ট ট্রেসিং করা হয়েছে। এ কারণে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। সরকার করোনা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনীতি পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা সমানতালে করে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এ খাত ঘুরে দাঁড়াতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। পর্যটনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতির আরও অনেক কিছু। ফলে সামগ্রিকভাবে সিঙ্গাপুরের জিডিপি মাইনাস ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জানা গেছে, বর্তমানে সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সংখ্যা (ডিবি চ্যামের সদস্য) প্রায় ৫০ জনের মতো। যাদের বছরে টার্নওভার গড়ে ২ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার (সিঙ্গাপুর)। করোনার কারণে এদের অনেকেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। সরকারের তরফে বেশকিছু সহায়তা দেয়া হচ্ছে। যেমন-ভাড়া মওকুফ, নগদ সহায়তা এবং স্বল্প সুদে ঋন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এ সহায়তা দিয়ে আগের অবস্থায় কখনই ফিরে যেতে পারবেন না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সিঙ্গাপুরে বহু বাংলাদেশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। যেমন- বাংলা খাবার হোটেল, অনলাইন মানি ট্রান্সফার শপ, মোবাইল রিচার্জের দোকান, নিত্যপণ্যের দোকান ও ক্যাটারিং সার্ভিস। তারা হয়তো আর কখনই ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।


কমেন্ট বক্স
notebook

ফুফুর টাকা হাতিয়ে নিতে ভাতিজার ‘ছিনতাই নাটক’