করোনা প্রতিরোধে আনুষ্ঠানিক লকডাউনের প্রথম দিনে চুয়াডাঙ্গা
মেহেরাব্বিন সানভী:
চুয়াডাঙ্গায় আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউনের ঘোষণার প্রথম দিনে পুরো শহর যেন রূপ নিয়েছে নীরবতা পালনের। গত এক মাস সরকারিভাবে সবকিছু বন্ধ থাকার নিষেধাজ্ঞা, ১৪ দিন চুয়াডাঙ্গায় কার্যত লকডাউন থাকার পর অবশেষে গত বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলাম সরকার এক গণবিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা জেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন ঘোষণা করেন। এক দিনে চুয়াডাঙ্গায় ছয়জন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের পর এ লকডাউন ঘোষণা করা হয়।
গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জনের অনুরোধপত্র এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলা সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ ঝুঁকি ও বিস্তার প্রতিরোধের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হলো। লকডাউনের সময়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়ক এবং নৌপথে অন্য কোনো জেলা হতে কেউ এ জেলায় প্রবেশ করতে পারবে না। এই জেলা হতেও কেউ অন্য জেলায় যেতে পারবে না। জেলার অভ্যন্তরে আন্ত:উপজেলা যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। সব ধরনের গণপরিবহন ও জনচলাচল বন্ধ থাকবে। তবে, জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত যানবাহন, যেমন রোগীবাহী গাড়ি, ওষুধ ও পণ্যবাহী গাড়ি, কৃষিপণ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য পরিবহনের নিয়োজিত গাড়ি চলাচল এর আওতার বাইরে থাকবে এবং ব্যাংকিং সেবা সীমিত পরিসরে চলবে। আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যা ছয়টা থেকেই এই ঘোষণা কার্যকর হবে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
কার্যত লকডাউনের মধ্যে যদিও কিছু মানুষের চলাচল থাকত, তবে এ ঘোষণার পর কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় চুয়াডাঙ্গা শহরে মানুষের সমাগম তেমন নেই। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও ঘরে অবস্থান নিশ্চিত করতে এবং রাস্তায় চলাচল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। প্রয়োজন ছাড়া কাউকে রাস্তায় থাকতে দেওয়া হচ্ছে। কেউ বের হলে তাঁকে পুলিশের জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে জরুরি সেবার যান চলাল করছে। বড়বাজার, কোর্ট মোড়, শহীদ আবুল কাশেম সড়ক, কোর্ট রোডসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অবস্থান নিয়ে আছেন। একসঙ্গে দুজন দেখলে সচেতন করে দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার দেখলেই থামাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী। সব যানবহন বন্ধ থাকায় শহরের বাস টার্মিনালে দেখা যায়নি তেমন লোকসামগমের। শহরের সবথেকে ব্যস্ততম স্থান বড় বাজার চৌরাস্তার মোড়। হাজার হাজার মানুষের চলাচল এ স্থান দিয়ে। সেই চৌরাস্তার মোড়ে কোনো মানুষকে দাঁড়াতেই দেওয়া হচ্ছে না। কয়েকজন আছেন, তবে তাঁরাও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য।
প্রতিদিন সকালে যে মাছের আড়তে থাকত মাছ ব্যবসায়ীদের পদচারণা, মাছের দরদাম হাঁকা, গতকাল তেমন ভিড় লক্ষ্য করা যায়নি সে মাছের আড়তে। প্রথম রোজার আগের দিন ইফতার বা সেহরিসামগ্রী কেনাকাটার জন্য মুদিখানার দোকগুলোতে যে হিড়িক লাগত, এবারে সেই ভিড় লক্ষ্য করা যায়নি। করোনাভাইরাসের কারণে যারা সামর্থবান, তাঁরা আগেই কেনাকাটা করেছেন। তবে সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষদের কেনাকাটা করতে দেখা যায়নি।

এদিকে, খুচরা মাছের বাজারসহ সবজির বাজার চুয়াাডঙ্গা টাউন মাঠে স্থাপন করা হয়েছে। যে শুক্রবারে মাছ ও কাঁচাবাজার জমে ওঠে, মানুষের ভিড়ে হাঁটা যায় না, সেখানে গতকাল শুক্রবার হওয়া সত্ত্বেও নিরাপদ দূরুত্ব মেনে বাজার করতে দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে। মূলত তেমন ভিড়ই লক্ষ্য করা যায়নি।
নিত্যপণ্য ও ওষুধ বাদে সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ। বেশ কিছু ওষধের দোকানও বন্ধ দেখা গেছে। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে যানবাহন ও মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে জেলা সবকটি প্রবেশপথসহ ১১টি স্থানে পুলিশের তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। জরুরি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী গাড়ি ছাড়া কোনো যানবাহন জেলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
এদিকে, চার দিন আগে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক ইজিবাইক ও রিকশা চলাচল বন্ধের গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন। এরপর জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরিয়ে যানবহন না পেয়ে নিরুপায় হয়ে হেঁটেই যাচ্ছেন সাধারণ মানুষেরা। আবার অনেকেই অলি-গলির মধ্যে দিয়ে রিকশা কিংবা অটো চালকদের প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কৌশলে চলার সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছেন। চুয়াডাঙ্গা টাউন ফুটবল মাঠে কাঁচাবাজার করতে আসা মানুষদের কেউ কেউ হয় আরামপাড়ার মধ্যে রিকশা দাঁড় করিয়ে বাজার কারছেন, অথবা সুবিধাজনক স্থানে পাড়ার মধ্যে রিকশা দাঁড় করিয়ে নিজের জরুরি কাজ সম্পন্ন করছেন। এককথায় রিকশা ও ইজিবাইক চালকদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পুলিশের।
অন্যদিকে, শহরে কঠোর অবস্থানে কাজ করছে প্রশাসন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারি নির্দেশনা না মানায় চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা আদায় করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ জেলার বিভিন্ন স্থানে এ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। একই সঙ্গে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও কঠোর অবস্থানে ছিল।