পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও পাননি অনেকে
- আপলোড তারিখঃ
০৭-০৪-২০২০
ইং
করোনা সংকট : ত্রাণ বিতরণে পছন্দ-অপছন্দের ছাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার বেশ কিছু যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ রাখার জন্য গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মজীবী মানুষ এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ঘর থেকে তাঁরা কেউ বের হতে পারছে না। মূলত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বাংলার ১৭ কোটি মানুষ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশের ন্যায় চুয়াডাঙ্গাতেও দুস্থ, হতদরিদ্র ও কাজহীন মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। কিন্তু উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রকৃত দুস্থ, হতদরিদ্র ও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সমস্যায় কাজ না থাকা মানুষের সংখ্যা এবং তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দের পরিমাণ অপ্রতুল বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো কোনো ওয়ার্ডে যেখানে কয়েক হাজার দুস্থ এবং নি¤œ আয়ের কাজহীন মানুষ রয়েছেন, সেখানে বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রী বণ্টন করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র এক থেকে দেড় শ জনকে। অবশিষ্ট বৃহৎ সংখ্যার দুস্থ মানুষ থেকে যাচ্ছেন ত্রাণের বাইরে।
ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ খুবই সামান্য হওয়ায় এক দিকে যেমন প্রাপ্ত খাদ্যসামগ্রী বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘কাকে রেখে কাকে দেব’ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে বদনামও নিতে হচ্ছে। বরাদ্দের সঙ্গে চাহিদার সামঞ্জস্য না থাকায় যাঁরা ত্রাণ পাচ্ছেন না, তাঁরা এক ধরনের সন্দেহের চোখে দেখছেন জনপ্রতিনিধিদের। চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় রেখে বরাদ্দ না দেওয়ায় ত্রাণপ্রত্যাশীদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝিরও ক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) ও চেয়ারম্যান বা পৌরসভার কাউন্সিলর ও মেয়রদের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের দুস্থদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সেই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের বেশিরভাগই সাধারণত রাজনৈতিক বিবেচনায় ও নিজস্ব সম্পর্কের ভিত্তিতে তালিকা করছেন। এর ফলে প্রকৃত দুস্থদের অনেকে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। আবার ‘দুস্থ’ কিংবা ‘হতদরদ্রি’ কে বা কারা সেটিও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নেই। ফলে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে মূলত প্রাধান্য পাচ্ছে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি।
এতে এমনও ঘটনা ঘটছে, একই ব্যক্তি একাধিকবার কিংবা প্রয়োজন না থাকলেও ত্রাণ পাচ্ছেন। আবার প্রকৃত অর্থেই অসহায় হয়েও একবারও সরকারি ত্রাণ পাচ্ছেন না অনেকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, দুস্থ মানুষের তালিকা প্রণয়ন এবং চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দের পুরো প্রক্রিয়াটিতে কিছুটা অপরিকল্পিনার ছাপ রয়েছে। যার কারণে এক দিকে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে অযৌক্তিকভাবেই বদনামের কবলে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। অন্যদিকে, সরকারের বরাদ্দেরও অপচয় হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৯ হাজার ৯ শ ৫০ পরিবারের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৮১৭ পরিবারের মধ্যে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৫ হাজার পরিবারের মধ্যে ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ১১ শ পরিবারের মধ্যে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, দামুড়হুদা উপজেলায় ৫ হাজার পরিবারের মধ্যে ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৫৮০ পরিবারের মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, জীবননগর উপজেলায় ৭ হাজার ২শ ৭২ পরিবারের মধ্যে ৭২ মেট্রিক টন চাল ও ৪ শ পরিবারের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ ২৭ হাজার ১শ ৫০ পরিবারের মধ্যে ২৭১ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন চাল এবং মোট ২ হাজার ৮ শ ৯৭ পরিবারের মধ্যে ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। মজুদ আছে ৩৩৬ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৮ লাখ ২৪ হাজার ৫ শ টাকা।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য মজুদ আছে। সরকারি ত্রাণ প্রতিনিয়তই দেওয়া হচ্ছে। যদি চুয়াডাঙ্গায় ত্রাণ শেষ হয়ে যায়, তাহলে চাহিষা মোতাবেক সরকার আরও পাঠাবে। আমি একটি কথা বলতে পারি, চুয়াডাঙ্গায় কেউ না খেয়ে থাকবেন না। এরপরও যদি ত্রাণের প্রয়োজন হয়, তবে স্থানীয় পর্যায়ে ধনী ব্যক্তিদের থেকে সহযোগিতা নিয়ে ত্রাণ দেওয়া হবে।’ প্রকৃতজন ত্রাণ পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকৃত প্রাপ্যদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। যদি কোথাও এ বিষয়ে কারো নামে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুয়াডাঙ্গায় দুস্থ, অসহায় এবং কাজহীন মানুষের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘আমি মনে করি ত্রাণ যথেষ্ট পরিমাণে আছে। আর সঠিক তথ্য যাচাই করে, তা প্রকৃতজনকে দেওয়া হচ্ছে। এরপরও যদি সমস্যা হয়, তাহলে সরকার আরও ত্রাণ পাঠাবে। কোনো মানুষ না খেয়ে থাকবে না।’
কমেন্ট বক্স