সুফল ও পরিবর্তন এনেছে এই মহাসঙ্কটের দিনেও
- আপলোড তারিখঃ
০৫-০৪-২০২০
ইং
করোনা শুধু আতঙ্ক আর মৃত্যু দেয়নি
মেহেরাব্বিন সানভী:
করোনা সংক্রমন নিয়ে আতঙ্কের শেষ নেই। পৃথিবীর বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্র পর্যন্ত এখন করোনা আতঙ্কে আছে। গতকাল শনিবার অব্দি সারা বিশ্বে মৃতের সংখ্যা ৬১ হাজার ছাড়িয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা ১২ লাখের কাছাকাছি মানুষ। বাংলাদেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৭০ জন, মারা গেছেন ৮ জন। ভয়াবহতা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। করোনার প্রতিরোধে সারা বিশ্ব প্রায় লকডাউন। কোটি কোটি মানুষ হয়েছেন ঘরবন্দী। এতে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে গেছে, তেমনি নি¤œ আয়ের মানুষ পড়েছেন প্রচ- কষ্টে। এ বিশ্ব সঠিকভাবে জানে না, করোনা আর কতটা ভয়াবহ হবে। করোনায় মৃত্যুর মতো নেতিবাচক দিক থাকলেও এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আতঙ্ক, ভয়, মৃত্যুর সঙ্গে করোনার কারণে কিছুটা প্রাপ্তিও আছে। সুফল ও পরিবর্তন এসেছে এই মহাসঙ্কটের দিনেও। ইতিমধ্যে এর সব থেকে বেশি সুফল পেয়েছে প্রকৃতি। শুধু প্রকৃতি নয়, বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে মানুষে মানুষে। বেড়েছে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য। সামাজিক শিষ্টাচার ও পরিচ্ছন্ন জীবন মানুষের মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন আনছে।
কমছে দূষণ :
অন্য দেশের মতো আমাদের দেশে লকডাউন না থাকলেও বন্ধ রয়েছে সবকিছু। নানা অসুবিধার মধ্যেও কার্যত ঘরবন্দী সিংহভাগ মানুষ। রাস্তা থেকে উধাও যানবাহন। শহরের অধিকাংশ রাস্তা ফাঁকা, শুনসান নিরবতা। এরমধ্যেই বদলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো চুয়াডাঙ্গা শহরেরও চেনা ছবি। কারণ, ক্রমশ সবুজ হচ্ছে শহর। রাস্তায় যানবাহন না থাকায় উধাও হয়েছে দূষণ। এর ফলে অলি-গলি থেকে রাজপথ সর্বত্রই সবুজ আর সতেজ হচ্ছে গাছপালা। এখানেই শেষ নয়, দূষণ না থাকায় বাড়ছে দৃশ্যমানতা। খালি চোখে আগের তুলনায় অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি যাচ্ছে। অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন মানুষ। সবটাই সম্ভব হয়েছে অঘোষিত লকডাউনজনিত দূষণ রোধের কারণেই। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ কমছে, বাড়ছে অক্সিজেনের মাত্রা। এর ফলে শ্বাস নিতে সুবিধা হচ্ছে মানুষের। পরিবেশবিদদের মতে, মানুষের হাজারো সমস্যা হলেও কিছু সুফল হচ্ছে। তারই প্রমাণ মিলছে শহরগুলোতে। গত কয়েকদিনে ঢাকা শহরের বিভিন্ন পার্কগুলোতে চেনা ছবি পরিবর্তন হয়েছে। সারা বছর শহরের অধিকাংশ গাছপালা থাকে ধুলোয় ভরা। একইভাবে শহরের আইল্যান্ডগুলো সব সময় অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা যায়। কিন্তু গত কয়েক দিনে রাস্তায় সেভাবে লোকজন নেই, যানবাহনও প্রায় চলছে না বললেই চলে। এর ফলে দূষণ কমছে অনেকটাই।
নেই যানজট:
রাজধানী ঢাকাসহ চুয়াডাঙ্গার চিরচেনা রূপে এসেছি পরিবর্তন। যে যানজটে জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত, সেখানে এসেছে প্রশান্তি। ঢাকার যেসব রাস্তায় সিএনজি, রিকশার আনাগোনা লেগে থাকত, যেসব গলিতে ফেরিওয়ালার ডাকে সরগরম থাকত সকাল-দুপুর, সেখানে এখন নিরবতা। বড় সড়ক বা অলিগলিতেও রিকশা বা সিএনজির দেখা মিলছে না। দখলমুক্ত হয়েছে ফুটপাত।
সড়ক দূর্ঘটনা কমেছে:
বিশ্বব্যাপী সড়ক, নৌ, রেল ও বিমান পথে চলছে লকডাউন। ফলে সব মাধ্যমেই দূর্ঘটনা কমেছে। নিয়ন্ত্রিত যান চলাচলে এসেছে ঝুঁকিমুক্ত জীবন। আগের মতো নেই কোন দুঃসংবাদ। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তথ্যমতে, এই কয়দিনে চুয়াডাঙ্গাতেও নেই কোনো সড়ক দূর্ঘটনার খবর।
বেড়েছে সামাজিক বন্ধন :
করোনার এই সঙ্কটের দিনে বিশ্ব আজ কার্যত লকডাউন। মানুষ কর্মস্থল ছেড়ে ঘরের মধ্যে অবস্থান করছে। ফলে দৈনিক কাজের যে ব্যস্ততা তা আজ নেই। পরিবারের সবাই আজ একত্রিত হয়েছে। বাসায় বসে সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছে, একে অন্যের সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতে উঠেছে, অনেক দিনের না বলা কথাগুলোও তাঁরা বলছেন প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। মোবাইল ফোনে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নিচ্ছেন সবাই। এতে করে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেছে।
মানবিক হয়েছে মানুষ :
মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব, বিরোধ, হিংসা অনেকটা কমে এসেছে। বেড়েছে মানবিকগুণাবলি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দূর হয়েছে। সহনশীল হয়েছে মানুষ। এখন নিজের সামর্থ অনুযায়ী অন্যের সহায্য করতে চেষ্টা করছেন তাঁরা। দরিদ্র-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে অনেকেই। দানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে সবার। মহান আল্লাহ যেখানে এই দানের কথা বারবার বলেছেন, তা এখন উপলব্ধি করতে পারছে মানুষ।
শুদ্ধাচার ও শিষ্টাচার:
সমাজে ভালো-মন্দ দুটি দিকই বিরাজ করে। তবে মন্দের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়। কিছুদিন আগে খুন-সন্ত্রাস, ধর্ষণ, ছিনতাই ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলেও এইদিনগুলোতে সবকিছু নিয়ন্ত্রেণে এসেছে। সমাজচিন্তাবিদগণ মনে করেন, ‘যা কিছু ভালো আমাদের তা নিয়েই আলোচনা করতে হবে। ভালো নিয়ে আলোচনা করলে সমাজে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা পাবে। তাতে আমাদের সমাজ আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে। করোনা সঙ্কট শুদ্ধাচারের পথকে সুগম করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে কিছু শিষ্টাচার মানুষের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তা আবারও ফিরে এসেছে। বিশেষ করে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার। কাশি বা হাঁচির সময় আমরা কিছুদিন আগেও সচেতন ছিলাম না। এখন আমরা টিস্যু ও কাপড় দিয়ে নাক ও মুখ ঢেকে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছি। এ সময় হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু করোনার এ সময়ে নয়, সব সময়ই হাত ধোয়া ও হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে, আপনজন ও সমাজের অন্যদের নিরাপদ রাখার স্বার্থেই এটি করতে হবে। বিষয়গুলো কিন্তু নতুন করে বলা হচ্ছে না। এর আগে যখন সার্স ও সোয়াইন ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছিল, তখনো এসব বলা হয়েছে।’
ইতিবাচক চিন্তা:
মানুষকে ইতিবাচক বার্তা দিয়ে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যে যার মতো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ব্যক্তিগত, সাংগঠনিক বা রাজনৈতিকভাবেও সচেতন হওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। অন্যায়, অবিচার থেকে দূরে সরে এসে সবাই ইতিবাচক চিন্তা করছে।
সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য:
চারদিকে মৃত্যু আতঙ্ক। যে মহামারি এসেছে, তা প্রতিরোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই মানুষের হাতে। নানা চেষ্টা করেও অসহায় মানুষ। এরই মধ্যে সবার উপলব্ধি এসেছে এই মহামারি থেকে মুক্তি দিতে পারেন একজন। তিনি সৃষ্টিকর্তা। প্রকাশ্যে হোক আর অপ্রকাশ্যে সবাই মৃত্যুকে ভয় করে। তাই অজানা আতঙ্কে মানুষ এখন সৃষ্টিকর্তার স্মরণাপন্ন হয়েছে। নিরবে ঘরের মধ্যে বসেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারা আশ্রয় চাচ্ছে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার কাছেই। ফলে বিপদগামী মানুষ সৃষ্টির রহস্য ও অদৃশ্য শক্তির বিষয়ে আরও বেশি বিশ্বাস অর্জন করতে পারছে।
এক হয়েছে বিশ্ব নেতারা:
করোনা সঙ্কট কোনো নিদৃষ্ট একটি এলাকা বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বব্যাপী। ফলে পৃথিবীর সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সঙ্কট মোকাবেলায় এক হয়েছেন। একে অন্যের সহযোগিতা চাইছেন এবং নিচ্ছেন। সবাই সবার খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সার্কভূক্ত দেশগুলোর নেতারা এক হয়েছেন এই সঙ্কট মোকাবিলায়।
নেই যুদ্ধ:
যুদ্ধের নামে যে পৃথিবীতে প্রতিদিন কোনো না কোনো দেশ হয়েছে অন্ধকার, যেখানে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে গেছে, অস্ত্র ও গোলার প্রকা- শব্দে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়েছে, সেখানেও আজ শান্তি প্রতিষ্ঠিত। নেই কোনো যুদ্ধ, নেই কোনো হামলা। সবাই অদৃশ্য এক ভাইরাসের কাছে পরাজিত। তাইতো যুদ্ধ বন্ধ করে নিজেকে, নিজের দেশকে রক্ষায় ব্যস্ত যুদ্ধবাজরা।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি:
যদিও করোনাকে প্রতিরোধে এখনও চিকিৎসাবিজ্ঞান সফলতা পায়নি, তবে এই সঙ্কট সবার মধ্যে চিন্তার বীজ বপন করেছে। চিকিৎসকেরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, দিন-রাত করোনা মোকাবিলায় একপ্রকার যুদ্ধ করছেন তাঁরা। হাসপাতাল, চিকিৎসা সরঞ্জামের উৎপদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ রোগীদের অসুবিধা দেখা দিলেও সবাই নিজেদের সুরক্ষায় নিজেরাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকেরাও মানবিক হয়ে উঠেছেন। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তাঁরা রোগীকে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন। সরকারও চিকিৎসা খাতে সাহায্যের মাত্রা বাড়িয়েছেন।
সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিলুপ্তি:
এ এমন এক সঙ্কট ও মাহামারি, যা কোনো একক গোষ্ঠীর ওপর এসে পড়েনি। সমগ্র মানবজাতি এতে আক্রান্ত। কোনো একটি ধর্মের বা গোত্রের ওপর এ ভাইরাস আক্রমন করেনি। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, ইহুদি ও খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষের মধ্যেই করোনা হানা দিয়েছে। সবাই উপলব্ধি করেছেন এ সঙ্কট কাটিয়ে মুক্তি দিতে পারেন শুধুই একজন। আর তিনি মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। সর্বোপরি মানুষ পরিশুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা সহনশীল হয়ে জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুকে জয় করে আগামীর প্রত্যাশায় এক হয়ে সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করছেন প্রত্যেকে। দুনিয়া কাপানো এই কোভিড-১৯ বিজ্ঞানের আর্শিবাদে নিশ্চয় একদিন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু এ ভাইরাসটির প্রতিরোধে লকডাউন ব্যবস্থার কারণে সমাজে যে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, তা চিরকাল থাকুক এই প্রত্যাশা।
কমেন্ট বক্স