আছে সরঞ্জাম, তবুও নেওয়া হয় না ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাস’
- আপলোড তারিখঃ
১১-০২-২০২০
ইং
চুয়াডাঙ্গায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় নিয়মিত নেওয়া হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাস। শিক্ষকদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নিতে বলা হলেও তাঁরা ক্লাস নেন না বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সপ্তাহের এক দিন স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার কথা থাকলেও জেলার প্রায় ৮০ ভাগ স্কুলের শিক্ষার্থীরা মাল্টিমিডিয়া ক্লাস সম্পর্কে কিছুই জানে না। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন স্কুলগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস না হওয়ায় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামগুলোও প্রায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে আগ্রহ থাকলেও আধুনিক এ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। তবে জেলার স্কুলগুলোতে নানা সমস্যা থাকলেও নিয়মিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাস হয় বলে জানিয়েছেন জেলার শিক্ষা কর্মকর্তরা।
জানা গেছে, ২০১০ সালে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সরকার প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ২০ হাজার ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের প্রতিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ল্যাপটপ-কম্পিউটার ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহ করা হয়। তবে সরকারের এই পরিকল্পনার দশ বছর অতিবাহিত হলেও সব স্কুলের শ্রেণিকক্ষে নেওয়া হয় না মাল্টিমিডিয়া ক্লাস।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে শিক্ষকেরা জানান, সরকারিভাবে অল্প দিনের আইসিটি ট্রেনিংয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের জন্য তাঁদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। ফলে স্কুলে মাল্টিমিডিয়ার সরঞ্জাম থাকলেও শিক্ষকদের অদক্ষতাসহ স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষক-সংকটের কারণেই স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাস বন্ধ রয়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা জেলায় ৪৪৫টি প্রাথমিক ও ১৪১টি মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে। জেলার ৩৫৮টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব কটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। তবে এসব স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু আছে শুধু নামমাত্রই। স্কুলগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের জন্য সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকেরা তা ব্যবহার করেন না। জেলার বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ থাকে তালাবদ্ধ। এছাড়া অনেক স্কুলে দেখা যায়, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার ল্যাপটপ ঠিকমতো ব্যবহারই করতে পারেন না শিক্ষকেরা। এ ছাড়া গ্রামের বেশ কয়েকটি মাধ্যমিক স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের জন্য সরকারের দেওয়া ল্যাপটপ শিক্ষকেরা ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত কাজে।
চুয়াডাঙ্গা শহরের সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিজিয়া খাতুন জানায়, ‘স্কুলে মাল্টিমিডিয়ার সব সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকেরা নিয়মিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেন না। এতে করে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আমরা চাই, শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নিয়মিত হোক।’ তবে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকের দাবি, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে নেওয়া হয় মাল্টিমিডিয়া ক্লাস। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ‘শিক্ষক-সংকটের কারণে স্কুলে নিয়মিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া এখানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে এক দিন মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের একমাত্র ঝিনুক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছাড়া কোনো স্কুলেই ঠিকমতো নেওয়া হয় না মাল্টিমিডিয়া ক্লাস। জেলা প্রশাসন বা শিক্ষা কর্মকর্তারা স্কুল পরিদর্শনে গেলে সে দিনের জন্য আয়োজন করা হয় সাজানো মাল্টিমিডিয়া ক্লাস।
বোহালগাছী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিম উদ্দিন জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাস মাঝেমধ্যে নেওয়া হয়। তবে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের জন্য ভিডিও কন্টেন ডাউনলোড করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া খুবই কষ্টকর ব্যাপার। যার কারণে সহকারী শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নিতে আগ্রহী হন না।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শঙ্করচন্দ্র ইউনিয়নের ৫৫ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস কী, তা তারা জানে না। স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রাতুল জানায়, ‘মাল্টিমিডিয়া কøাসের কথা শুনলেও কোনো দিন স্যার-ম্যাডামরা তা নেননি।’
আলমডাঙ্গা উপজেলার ৭০ নম্বর খাসবাগুন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী লিমা খাতুন বলেন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। ক্লাস নিতে বললেও শিক্ষকেরা মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেন না।
এ বিষয়ে খাসবাগুন্দা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইয়াকুব আলী জানান, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস সম্পর্কে প্রশিক্ষিত যে শিক্ষক রয়েছেন, তিনি নিজেই এ সম্পর্কে অদক্ষ। তা ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নিতে সরকার যে আইসিটি ট্রেনিং শিক্ষকদের দিয়েছে, তাতে কোনো লাভ হয়নি। যার কারণে শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
প্রাথমিক স্কুলগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের এ বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জেলার অনেক প্রাথমিক স্কুলে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ায় ক্লাস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে। তবে যেসব স্কুলে সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়া হচ্ছে না, সেসব স্কুলের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিখিল রঞ্জন চক্রবর্ত্তী বলেন, চুয়াডাঙ্গায় সব মাধ্যমিক স্কুলেই নেওয়া হয় মাল্টিমিডিয়া ক্লাস। জেলার প্রতিটি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নিয়মিত নেওয়া হচ্ছে কি না, অ্যাপসের মাধ্যমে তা পর্যাবেক্ষণ করেন তিনি।
কমেন্ট বক্স