পিঠা-পুলিতে চুয়াডাঙ্গায় এ এক নতুন ইতিহাস
- আপলোড তারিখঃ
০২-০২-২০২০
ইং
চুয়াডাঙ্গায় পিঠা উৎসব ও প্রতিযোগিতায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়
মেহেরাব্বিন সানভী:
ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই উৎসবের আমেজটা টের পাওয়া গেল। দেখেই মনে হচ্ছে যেন বিশাল এক মহাউৎসবের মহাযজ্ঞ। যা দেখে শীতের সকালে ঠাণ্ডা হিম বাতাসে উৎসবের আমেজটা যেন পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। যেমন বড় মাঠ, ঠিক তেমনি বড় স্টল আর অসংখ্য মানুষের ভিড়। চারিদিকে মৌ মৌ গন্ধ সাথে সকালের হালকা মিষ্টি রোদ। একদিকে বড় সাউন্ডবক্সে বাঙালিয়ানা গান, অন্যদিকে বাঙালী সাজে হাজারো মানুষ। কেউ বা শাড়ি, কেউ বা পাঞ্জাবি। ২০০ স্কয়ার ফিটের বড় বড় ১৫টি স্টলে হাজার রকমের পিঠা সাজানো। এর মধ্যে হৃদয় হরণ, ডিম সুন্দরী, বিবি খানা, চালতা পাতা, সাইকোহেজেন, রাজ কাঁঠাল, রোহিনী, তানজু, এলিয়ান, নীল সুন্দরি, প্রেম কাড়া, মহিমা, গোলাপ অন্যতম। নামের মতো এ সব পিঠা দেখতেও বেশ নজরকাড়া। এ ছাড়া মালপোয়া, তালের পিঠা, দুধ পুলি, ভাপা, চিতই, ডিম পিঠা, নকশি পিঠা, মুগ পাকন, পাটিসাপটা, লবঙ্গ লতিকা পিঠাসহ নানান রঙ ও ঢঙের বিচিত্র রকম সব পিঠা রয়েছেই। এতাক্ষণ বলছিলাম চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের আন্ত:বিভাগ পিঠা উৎসব প্রতিযোগিতার কথা। ‘এসো মিলি প্রাণে প্রাণে, পিঠাপুলি উৎসবে’ স্লোগান নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে শিক্ষার অংশ হিসেবে ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ও লালনের মাধ্যমে আগামী দিনের শিক্ষিত মায়েদের অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে এ পিঠা উৎসবের আয়োজন করে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ। গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় কলেজ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে এ উৎসবের উদ্বোধন করেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. কামরুজ্জামান। এ সময় তিনি বলেন, পিঠা উৎসব হচ্ছে আবহমান বাংলার উৎসব-পার্বণের অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য পাহাড়ি ও বাঙালি প্রত্যেকের সংস্কৃতির শেখড়ের সন্ধান দেয়। তাই এ উৎসব প্রতিবছর আয়োজন করা হবে। পিঠা উৎসবের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের বাঙালিত্বকে খুঁজে পাই। নতুন প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে রাখতে এমন প্রচেষ্টা। সেই লক্ষ্য থেকে অনুষ্ঠান চলে নিরন্তর। পিঠা উৎসবের মাধ্যমে বাঙালির কিছু হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য রক্ষা হচ্ছে। এই ধরণের উৎসব বাঙ্গালি সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম। এ রকম ভিন্নধর্মী আয়োজনের মধ্যদিয়ে কলেজে সকল প্রকার সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত থাকবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম বলেন, বাঙালির ইতিহাস থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে কিছু মধুর স্মৃতি ও উৎসব। ঐতিহ্যকে লালন করতে হলে পিঠা উৎসবের প্রয়োজন আছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরকেও এগিয়ে যেতে হবে। তার মানে এই নয় যে, আমরা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ভুলে যাবো। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা বাঙালি। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের এ আয়োজন অসাধারণ। হাজারো মানুষের সমাগম দেখে সত্যিই ভালো লাগছে। এ আয়োজন মহা উৎসবে রূপ নিয়েছে। এ সময় তিনি, শিক্ষার্থীদের প্রতি মাদক, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও দূনীর্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুন্সি আবু সাঈফের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. এ কে এম সাইফুর রশীদ, চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরি জিপু, শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর এস এম ইস্রাফিল।
স্বাগত বক্তব্যে আন্ত:বিভাগ পিঠা উৎসব প্রতিযোগীতা কমিটির আহ্বায়ক বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল আজিজ বলেন, এ কলেজে যোগদানের পর ২০১৭ সালে আমি প্রথম পিঠা উৎসবের আয়োজন করি। ২০১৭ থেকে পর পর তিনবার ২০১৯ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ আয়োজন ছিলো। এখন খুব ভালো লাগছে, কলেজের সকল বিভাগকে নিয়ে মহাউৎসবে পরিণত হতে দেখে। বাঙালীর ইতিহাসকে ধরে রাখতে এ পিঠা উৎসব অনবদ্য অবদান রাখবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান খোন্দকার রোকনুজ্জামান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আব্দুল জব্বার, দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. আতিয়ার রহমান, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবুল কালাম, রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জাহাঙ্গীর আলম, ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মনিরুজ্জমান, ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মকছুদুল হক খান চৌধুরী, অর্থনীতি বিভাগের বিভাগিয় প্রধান আব্দুল ওয়াদুদ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ফারজানা কেতকি, রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মাহবুবুর রহমান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ফারুক হোসেন, গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হেমায়েত আলি, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. মমিনুল ইসলামসহ চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারি অধ্যাপক ও প্রভাষকবৃন্দ।
পিঠা উৎসবে বাঙালীয়না পোশাক শাড়ী পরিধান করে ছাত্রীরা ও পাঞ্জাবি পরে ছাত্ররা বাহারি পিঠা নিয়ে অংশ নেন। ইংরেজি বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্রী আভা বলেন, ‘পিঠা খেলে ঐতিহ্য টিকে থাকবে। এ জন্য আমরা বলছি, ‘পিঠা খাও ঐতিহ্য ধরে রাখো।’
কলেজের বাংলা বিভাগের স্টলের ছাত্রী শোভা বলেন, আমরা এবার বিভিন্ন পিঠা নিয়ে আমাদের স্টল সাজিয়েছি। এর মধ্যে ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা, ডিম পিঠা অন্যতম। এর সঙ্গে যোগ করে স্টলের আরও দু’জন বলেন, ‘এ ছাড়াও ছিল ঝুলি, মাংস পিঠা, শামুক পিঠা, সূর্যমুখী, নকশা, পাকন পিঠা। উৎসবে অংশগ্রহণ করা অন্য পিঠা স্টলগুলোতেও ছিল পিঠার বৈচিত্র্যতা। উৎসবে আসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পিঠা খেয়ে দেখেছেন। ‘প্রতি বছরই এ উৎসব হয়। আমাদের কাছে খুব ভালো লাগে এ উৎসবে অংশগ্রহণ করতে। শীত এলেই আম্মু পিঠা বানায়। তবে ক্যাম্পাসে এ রকম উৎসবে সবার সঙ্গে পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা। পিঠা খেতে খেতে বলছিলেন উৎসবে আসা দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র নাজমুল, কাসেব ও জয়।
কলেজের বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, ইসলামের ইতিহাস, গণিত, ইতিহাস, একাদশ, ডিগ্রি (পাশ) সহ মোট ১৫টি বিভাগ এ প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করে। কোন কোন বিভাগ অনুষ্ঠান স্থলেই সরাসরি পিঠা তৈরি করে আবার কোন বিভাগ নির্ধারিত মূল্যে বা যেমন খুশি তেমন দামে দর্শনার্থীদেরকে পিঠা খাওয়াচ্ছিলেন। নির্ধারিত কমিটির বিচারকদের বিচারে ভালোর মধ্যে কিছুটা উৎকৃষ্ট বিভাগের ঘোষণা দেওয়া হয় পিঠা উৎসবের শেষে। প্রতিযোগীতায় সকল বিভাগকে পিছনে পেলে প্রথম স্থান অধিকার করেছে বাংলা বিভাগ। যৌধভাবে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে ইসলামের ইতিহাস ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ। তৃতীয় হয়েছেন উদ্ভীদবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
কমেন্ট বক্স