মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

সান্ধ্য কোর্সে কাড়ি কাড়ি টাকা

  • আপলোড তারিখঃ ০৪-০১-২০২০ ইং
সান্ধ্য কোর্সে কাড়ি কাড়ি টাকা
সমীকরণ প্রতিবেদন: বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৪৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু রয়েছে সান্ধ্যকালীন বিভিন্ন প্রোগ্রাম। নিয়মিত কোর্সের তুলনায় এসব কোর্সে অনেক বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। আর টিউশন ফির নামে নেয়া হয় কাড়ি কাড়ি টাকা। বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে কোর্স ফির পরিমাণ এক লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর এ টাকার বেশির ভাগ যায় শিক্ষকদের পকেটে। তাই নিয়মিত কোর্সের চাইতে সান্ধ্যকালীন বাণিজ্যিক কোর্সে শিক্ষকদের আগ্রহ থাকে বেশি। খোঁজ নিয়ে যানা যায়, ২০০২ সালে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম সান্ধ্য কোর্স বা ইভিনিং প্রোগ্রাম শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চারটি বিভাগে সান্ধ্য কোর্স চালু করা হয়। পর্যায়ক্রমে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও বাণিজ্যিক এ কোর্স চালু হয়। বর্তমানে দেশে ২০টির মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন নামে সান্ধ্য কোর্স চালু রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের আয়েরও বড় উৎস এসব কোর্স। ২০০২ সালে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ চারটি বিভাগে সান্ধ্য কোর্স শুরু করলেও বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে ইভিনিং মাস্টার্স, ডিপ্লোমা, স্পেশালাইজড মাস্টার্সসহ বিভিন্ন নামের সান্ধ্য কোর্স চালু রয়েছে বলে জানা গেছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও চালু রয়েছে সান্ধ্য কোর্স। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি অনুষদের অধীন বিভাগ রয়েছে ৫৯টি আর ইনস্টিটিউট রয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে ১৪টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউটে সান্ধ্য কোর্স চালু রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউটে সান্ধ্য কোর্স চালু রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রথম সান্ধ্য কোর্স চালু করে। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য বিভাগও বাণিজ্যিক এ কোর্স চালু করে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪টি বিভাগে চালু রয়েছে সান্ধ্য কোর্স। অপেক্ষাকৃত নতুন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও ছয়টি বিভাগে সান্ধ্য কোর্স রয়েছে। তবে সম্প্রতি এ বিশ্ববিদ্যালয়টি সান্ধ্য কোর্স বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতটি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগে সান্ধ্য কোর্স চালু রয়েছে। সান্ধ্য কোর্সের কারণে রাতের বেলা মেলায় পরিণত হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সান্ধ্য কোর্স চালু থাকার কারণে এক শ্রেণির শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। এতে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ৯টি বিভাগে প্রতি বছর নিয়মিত শিক্ষার্থী ভর্তি হয় প্রায় এক হাজার ২৫০ জন। অথচ এই বিভাগগুলোতে সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ভর্তি হয় প্রায় দুই হাজার ১০০ জন শিক্ষার্থী। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ৯টি বিভাগের সন্ধ্যাকালীন কোর্স ও চারটি প্রফেশনাল কোর্সে প্রতি বছর প্রতিটি সেশনে ৭২০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। বছরে সামার, উইন্টার ও স্প্রিং এই তিনটি সেশনে মোট ভর্তি হন দুই হাজার ১৬০ জন শিক্ষার্থী। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তি ও টিউশন ফি বাবদ নেয়া হয় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। প্রতি বছর এই ৯টি বিভাগের সন্ধ্যাকালীন কোর্স থেকে আয় হচ্ছে ৫০ কোটি টাকা, যার ৭০ শতাংশ টাকা শিক্ষকসহ আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় হয়। আর ৩০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু তা জমা হয় কি-না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই টাকার আলাদা হিসাব রাখে না বলে জানা গেছে। এদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলো সন্ধ্যাকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স চালু রেখেছে। ২০১১ সালে একটি ইনস্টিটিউটে এ কোর্স চালুর মাধ্যমে বাণিজ্যিক শিক্ষায় পা দেয় জাবি। বর্তমানে ১৮টি বাণিজ্যিক কোর্স চালু রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। জানা যায়, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের চারটি বিভাগে বছরে তিনটি সেশনে ভর্তি করা হয়। সাপ্তাহিক কোর্সে ৪০ থেকে ৫০ জন করে প্রতিটি সেশনে প্রায় ৫৫০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ভর্তি ও টিউশন ফি বাবদ এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা নেয়া হয়। এই হিসাবে প্রতি বছর এই চারটি বিভাগের সাপ্তাহিক কোর্স থেকে আয় হচ্ছে প্রায় ৯ কোটি টাকা। বাকি ১২টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটে প্রতি বছর দুুই হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হন। তারা ৭০ হাজার থেকে থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কোর্স-ফি দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্য কোর্স চালু রয়েছে, সেগুলোও নিয়মিত কোর্সের চেয়ে সান্ধ্য কোর্সে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করে। আর টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে এক লাখ থেকে আড়াই লাখ পর্যন্ত নেয়া হয়। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই সান্ধ্য কোর্সের অনুমোদন নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, তাই তারা নিজ দায়িত্বে এসব কোর্স চালু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সান্ধ্য কোর্সের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে জমা দিতে হয়। তবে কোথাও কোথাও এই নিয়ম শতভাগ অনুসরণ করা হয় না। তবে অনেক ক্ষেত্রে সান্ধ্য কোর্সের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয় বলে জানা গেছে। এদিকে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্য কোর্স বন্ধের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের সান্ধ্য কোর্স বন্ধের সুপারিশ করে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে সান্ধ্য কোর্স বন্ধে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর চিঠি পাঠায় ইউজিসি। ইউজিসির ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদনে সান্ধ্য কোর্স বন্ধের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক/স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সান্ধ্য কোর্স চালু রয়েছে যা শিক্ষার সার্বিক মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব সান্ধ্য কোর্স অবিলম্বে বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’ সান্ধ্য কোর্সের বিষয়ে ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজ বেগম বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত না করে আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করেই এ ধরনের কোর্স চালানো হচ্ছে। এসব কোর্সে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্লাসও নেয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সহজে সনদ পাওয়া যায়। আমরা এ জন্য প্রতিবেদনে কোর্সগুলো বন্ধের সুপারিশ করেছি। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসের চেয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্সে বেশি মনোযোগী। নিয়মিতদের ক্লাস ঠিকমতো না নিলেও সান্ধ্য কোর্সও ক্লাস তারা ঠিকই নেন। বিভাগের বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক সন্ধ্যার কোর্সে পড়ান। আর সহকারী, সহযোগী ও প্রভাষক দিয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়া হয়। পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে যথাযথ দায়িত্ব পালনেও কোর্স শিক্ষকরা অবহেলা করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, সন্ধ্যাকালীন কোর্সগুলো অনেকটা বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কোর্সে শিক্ষার্থীরা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভর্তি হন। তাই শিক্ষকদের মনোযোগ সেদিকেই বেশি। অনেক সময় শিক্ষকরা নিয়মিত কোর্সের ক্লাসে না গেলেও সন্ধ্যাকালীন কোর্সের ক্লাস নিতে যথাসময়ে উপস্থিত হন। শিক্ষাবিদরা বলছেন, অর্থনীতির ক্রমাগত সমপ্রসারণে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ব্যবসা বিষয়ে ডিগ্রি। বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা কাজে লাগিয়ে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রির রমরমা বাণিজ্য বাড়ছে। নামমাত্র ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়মিত শিক্ষার্থীর দ্বিগুণ শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। এতে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপাচার্য বলেন, আমরা এই কোর্সটি বন্ধ করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য মিটিংও ডাকা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, সান্ধ্য কোর্সে শিক্ষার্থীরা যে পরিমাণ টাকা টিউশন ফি দেয়, তার ৬০ শতাংশ টাকাই শিক্ষকরা নিয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা ব্যবহার করে মাসে মাসে লাখ লাখ টাকার বাড়তি বেতন নিয়ে তারা পকেট ভারী করছেন। এছাড়া নিয়মিত শিক্ষার্থীরা যেখানে সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস করতেন, সান্ধ্য কোর্স চালুর পর এখন করেন পাঁচ দিন। এর মানে তাদের শিখন কর্মঘণ্টা কমে গেছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা সময়মতো হয় না, পরীক্ষার খাতা সময়মতো দেখা হয় না। অথচ সান্ধ্য কোর্সে শিক্ষকরা ক্লাস নিয়ে বেড়াচ্ছেন। এগুলোর লাগাম টানা উচিত। ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজ বেগম বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও সান্ধ্য কোর্সের অনুমোদন নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বায়ত্তশাসনের দোহাই দিয়ে এসব কোর্স পরিচালনা করছে। আমরা এই কোর্স বন্ধের সুপারিশ করেছি। এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও সান্ধ্য কোর্স বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।’


কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী