অর্থনীতিতে ছন্দপতন
- আপলোড তারিখঃ
৩১-১২-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন দিয়ে শুরু করা যাক। মূল্যায়নটা গেল প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ওপর। প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়েছে অতিসম্প্রতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংক্ষেপে হলেও অর্থনীতির আকাশে কিছুটা কালো মেঘের কথা বলেছে। এই মেঘ জমেছে মূলত আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়া, দুর্বল রাজস্ব আয়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, শিল্প উৎপাদন ও সেবা খাতের কার্যক্রমে ধীরগতি, ব্যাংকে তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, শেয়ারাবাজারে দুরবস্থাসহ আরও কিছু কারণে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, কৃষি খাতে গতিশীলতা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মতো কিছু ভালো খবরও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে দুর্বলতার পাল্লাটাই ভারী মনে হচ্ছে। তা না হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা এবং রাজস্বনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শই বা দেবে কেন? অর্থনীতিকে বোঝার নানা উপাদান আছে। এর সব কিছুতেই যে ধীরগতি তা বলা যাবে না। সামগ্রিকভাবে কৃষির ফলন ভালো হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। কারখানায় গ্যাস সংযোগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার সূচকে বাংলাদেশের ৮ ধাপ উন্নতি হয়েছে। আবাসন খাতে গতি ফিরছে। বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে বেশ উন্নতি হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে অগ্রগতি হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় কিছু প্রকল্পের কাজ অনেকটাই দৃশ্যমান হয়েছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।
সামগ্রিক বিচারে এ কথা বলা যায় যে, বছরের প্রথম দিকের তুলনায় শেষের দিকে এসে অর্থনীতির গতি দুর্বল হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে হোঁচট খেয়েছে অর্থনীতি। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, শুধু উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্য বোঝা যাবে না। কয়েকদিন আগে পরিসংখ্যান ব্যুরো খবর দিল, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ঠিক একই সময়ে জানা গেল, গেল নভেম্বর মাসে রপ্তানি আয় ১১ শতাংশ কমে গেছে। আগের মাস অক্টোবরে কমেছিল ২১ শতাংশ। গত ১০ বছরে রপ্তানি এভাবে কমতে দেখা যায়নি। উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেক দেশ ডলারের বিপরীতে নিজেদের মুদ্রার মান কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। আবার কারখানায় সংস্কারের উন্নতি হলেও ক্রেতারা পোশাকের দর বাড়াচ্ছেন না। এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধিও তাদের চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে বেসরকারি খাতের বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অক্টোবরে এই হার মাত্র ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির সংযত মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক নিচে। গত জুন শেষে এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পরিসংখ্যানও আশাব্যঞ্জক নয়। বস্ত্রসহ কোনো কোনো শিল্পের কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ব্যয়ও কমেছে। মূল্যস্ম্ফীতিও সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে।
স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, এত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তাহলে বিনিয়োগ সম্পর্কিত সূচকগুলোতে এই নিম্নগতি কেন? ৮ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতির বেশ কিছু সূচকের পরিসংখ্যান ঠিক মানাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ার কথা। কর্মসংস্থানের ওপর পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ জরিপ নেই। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনে উপস্থাপিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে শিক্ষিত তরুণ এক-তৃতীয়াংশ বেকার। স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পাস করা শিক্ষার্থীর মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজারের অবস্থা আরও দুর্বল হয়েছে। উদ্যোক্তাদের পুঁজি ও ঋণ জোগান দেওয়ার এই দুই খাতেই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষত রয়েছে। বিশেষ সুবিধা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। তারল্য সংকট প্রবল হয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আমানত ফেরত দিতে না পারায় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শেয়ারবাজারের অবস্থা বছরজুড়েই খারাপ ছিল। বছরের শুরুর তুলনায় শেষে এসে শেয়ারবাজারের সূচক অনেক কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা :বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি কমে গেছে, যা চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে তেজি রেমিট্যান্স প্রবাহ অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়িয়ে এই ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মিশ্র প্রবণতা ছিল উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি, সহায়ক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে সামগ্রিক আমদানি ও রপ্তানি এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া অর্থনীতিতে কিছু নিম্নগতি নির্দেশ করে। সরবরাহের দিক থেকে শিল্প খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে শিল্প খাতে বিশেষত বৃহৎ ও মাঝারিশিল্পে উৎপাদনে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। শিল্পঋণের প্রবৃদ্ধিও পরিমিত। যদিও কৃষি খাতের কার্যক্রমে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার লক্ষণ রয়েছে তবে সেবা খাত কেন্দ্রিক কিছু পরোক্ষ নির্দেশক এ খাতের অগ্রগতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এনে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক রাজস্ব এবং মুদ্রানীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে।
পরিসংখ্যান কী বলে :
অর্থনীতির মৌলিক কিছু সূচকের অবস্থা বছরের শেষ দিকে এসে আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। রাজস্ব আয়ের কথা ধরা যাক। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এনবিআরের রাজস্ব আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের পরও রাজস্ব আয়ে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। নতুন আইনের সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারের যোগসূত্র স্থাপনে আশানুরূপ ফল আসেনি। আয়ে গতি কম থাকায় সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়ে গেছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই কারণে বাজেট ঘাটতিও বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৪৬ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ হাজার ২৮১ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই- নভেম্বর) রপ্তানি আয় প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছরে এ সময়ে রপ্তানি আয় বেড়েছিল ১৭ শতাংশ। রপ্তানি কমলেও রেমিট্যান্স অনেক বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ৯ শতাংশ। বিদেশের সঙ্গে চলতি হিসাবে ঘাটতি কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে ঘাটতি ছিল ২০০ কোটি ডলার। এ অর্থবছরের একই সময়ে যা কমে হয়েছে ১৩০ কোটি ডলার। অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে আমদানি ব্যয় কমেছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয় ১৮ শতাংশ কমে গেছে। মূল্যস্ম্ফীতি গত নভেম্বরে এসে তিন বছর পর ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিদায়ী বছরের ৯ মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ১২ শতাংশ ছুঁয়েছে। শেয়ারাবাজারের সূচক ১ হাজার পয়েন্ট কমে গেছে। বছরের প্রথম কার্যদিবস ১ জানুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ছিল ৫ হাজার ৪৬৫ পয়েন্ট। গতকাল ৩০ ডিসেম্বর সর্বশেষ কার্যদিবসে সূচকটি ৪ হাজার ৪৫২ পয়েন্টে নেমেছে।
কমেন্ট বক্স