বিশেষ চমক নেই আওয়ামী লীগে
- আপলোড তারিখঃ
২২-১২-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
চমক নেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ২১তম কাউন্সিলে ঘোষিত নতুন কমিটিতে। সম্পাদকীয় পদে রদবদল আর প্রেসিডিয়ামে তিনজন সদস্য যোগ করায় সীমাবদ্ধ (২০২০-২২) মেয়াদের কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকায়। তবে ঘোষিত কমিটি থেকে স্পষ্ট হয়েছে, সরকার ও দলকে আলাদা করার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা। বিশেষ করে দলের সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের না রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কঠিন সিদ্ধান্ত এ কাউন্সিলে বাস্তবায়ন করেছেন নবমবারের মতো সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২১তম জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সারা দেশ থেকে দলের সাড়ে সাত হাজার কাউন্সিলরের উপস্থিতিতে শুরু হয় এ অধিবেশন। সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস যাতে অর্জন করা যায় সে লক্ষ্যে দলের নেতাকর্মীদের কাজ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণই তার রাজনীতি। দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে কাজ করতে হবে। বাঙালি মুক্তির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা রয়েছে। এ দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে, এগিয়ে নিতে হবে অনেক দূর। তাই সংগঠনকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দেন তিনি। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে আওয়ামী লীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে সভাপতি পদে শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব করেন অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু। সমর্থন করেন পীযুষ ভট্টাচার্য। দুজনই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। সমর্থন করেন আব্দুর রহমান। সেই প্রস্তাবও কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর ফলে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেলেন ওবায়দুল কাদের এমপি। তিনি বর্তমানে সরকারের সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর কাউন্সিলরদের দেয়া ক্ষমতার বদৌলতে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আংশিক নেতার নাম ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা এবং পরে তা কণ্ঠে ভোটে পাস হয়। ঘোষিত কমিটিতে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন- সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফর উল্লাহ, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, নুরুল ইসলাম নাহিদ, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য, ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, রমেশ চন্দ্র সেন, অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান খান, আবদুল মতিন খসরু, শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান। এছাড়া পদাধিকার বলে শেখ হাসিনা এবং ওবায়দুল কাদেরও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন বিদায়ী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান এবং সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে পদার্পণ করলেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে ছিলেন না। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল আছেন মাহবুব-উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি। নতুন করে এ পদে এসেছেন ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। আগের কমিটিতে ড. হাছান মাহমুদ প্রচার সম্পাদক এবং আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে চতুর্থ মেয়াদে আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, দ্বিতীয় মেয়াদে আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এবং প্রথমবারের মতো এস এম কামাল হোসেন ও মির্জা আজমকে আনা হয়েছে। নতুন দুই সাংগঠনিক সম্পাদক আগের কমিটির সদস্য ছিলেন। উপ-দপ্তর সম্পাদক থেকে দপ্তর সম্পাদক হয়েছেন বিপ্লব বড়ুয়া। নতুন প্রচার সম্পাদক হয়েছেন ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ। এছাড়া স্বপদে বহাল আছেন আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ড. শাম্মী আহমেদ, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক পদে দেলোয়ার হোসেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক পদ পেয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর, মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে বহাল আছেন হারুন অর রশীদ, শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক পদে শামসুন নাহার চাঁপা, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক পদে অসীম কুমার উকিল, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক পদে ডা. রোকেয়া সুলতানা। তবে নতুন মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন মেহের আফরোজ চুমকি। আটটি পদের মধ্যে পাঁচটি ঘোষণা হলেও আরও তিন সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম ঘোষণা হয়নি। এছাড়া কোষাধ্যক্ষ, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক, শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক সম্পাদক, উপ-দপ্তর সম্পাদক, উপ-প্রচার সম্পাদক এবং কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদে কারো নাম ঘোষণা হয়নি। দলের প্রেসিডিয়াম সভায় আলোচনা করে এসব পদের নাম ঘোষণা করা হবে বলে জানান শেখ হাসিনা। এজন্য কাউন্সিলরদের কাছে অনুমোদন দেন। এছাড়া কাউন্সিল অধিবেশনে উপদেষ্টা পরিষদ, সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডে কিছু পরিবর্তন এনে অনুমোদন করা হয়েছে। মৃতদের বাদে বর্তমান বোর্ডের সবাইকেই বহাল রাখা হয়েছে। এর মধ্যে উপদেষ্টামণ্ডলীর নতুন সদস্য হয়েছেন মোজাফফর হোসেন পল্টু, মুকুল বোস, সালমান এফ রহমান, জয়নাল হাজারী, সংসদীয় বোর্ডে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি। আর স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডে যুক্ত হয়েছেন আব্দুর রহমান। কমিটিতে ঠাঁই হয়নি ৬ মন্ত্রীর: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বর্তমান সরকারের চার মন্ত্রী আওয়ামী লীগের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। তবে আংশিক ঘোষিত কমিটিতে নাম আসেনি মন্ত্রিসভার ছয় সদস্যের। নতুন কমিটিতে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে রয়েছেন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। পদ পাননি সরকারের মন্ত্রিসভার ছয় সদস্য হলেন— বিদায়ী কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও বর্তমান গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক এবং সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা, সাংগঠনিক সম্পাদক ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, এবারের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে সরকার এবং দলকে আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন সভাপতি শেখ হাসিনা। সরকারের এবং দলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় নেতাদের।দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় একটিও ঠিক মতো হয় না। আর এ কারণে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের দলে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সূত্র আরও জানায়, আগামী নতুন বছরের প্রথমার্ধে মন্ত্রিসভায় রদ বদল আনা হতে পারে। সে সময় দলীয় পদ হারানো সদস্যদের পদোন্নতি দেয়া হবে। একই সঙ্গে দলের দায়িত্ব পেয়েছেন এমন গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সরানো হতে পারে। কাউন্সিল অধিবেশনে রাখা বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকারের মধ্যে দলকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। দল যদি শক্তিশালী না হয় সরকার কোনোদিনও শক্তিশালী হবে না। শক্তিশালী সরকারের জন্য শেখ হাসিনার শক্তিশালী আওয়ামী লীগ সংগঠন অপরিহার্য। তাই আমাদের দলকে কলহ, কোন্দলমুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, কিছু কিছু জায়গায় মাঝে মাঝে বিশৃঙ্খলা হয়, বিশৃঙ্খলামুক্ত করতে হবে। অপকর্মকারীদের আওয়ামী লীগে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। আমাদের হাজার হাজার লাখো কর্মী রয়েছে, বিতর্কিত কোনো লোকের কোনো প্রয়োজন নেই। শীতের অতিথি পাখিরা সুসময়ে আসবে, দুঃসময়ে আর থাকবে না। সেই মৌসুমি অতিথিদের আমাদের দরকার নেই। এর আগে ২০ ডিসেম্বর শুক্রবার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকাল ৩টা ৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে দুই দিনব্যাপী জাতীয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
কমেন্ট বক্স