তীব্র শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, আমঝুপিতে দুজনের মৃত্যু
- আপলোড তারিখঃ
২২-১২-২০১৯
ইং
চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহে
দেখা মেলেনি সূর্যের; চরম দুর্ভোগে ছিন্নমূল মানুষ, ফুটপাতের দোকানে উপচে পড়া ভিড়
সমীকরণ প্রতিবেদন:
কনকনে শীত আর হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ জেলার জনজীবন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের অবস্থা চরম শোচনীয়। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন অনেকে। কুয়াশার পাশাপাশি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হচ্ছে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় চুয়াডাঙ্গায় ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিকে, তীব্র শীতে মেহেরপুর সদরের আমঝুপিতে দুই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা:
তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও শীতের তীব্রতা কমেনি একটুও। চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে এখনও বয়ে যাচ্ছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রার পারদ ওঠানামার পাশাপাশি কনকনে হিমশীতল বাতাসের প্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছে শীতের তীব্রতা। পৌষ মাসে এমন আবহাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এবার শীত এলো যেন জানান না দিয়েই। তীব্র শীতে জনজীবন একরকম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে চলা শীতের প্রকোপে শিশু ও বয়স্কোরা ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার যেখানে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি ও শুক্রবার ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল, তা শনিবার বেড়ে ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রিতে ঠেকেছে। তবুও কমছে না শীতের প্রকোপ। আর এই শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গতকাল শনিবার পর্যন্ত অর্ধশতাধিক রোগী ভর্তি হয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ক্রমেই তাপমাত্রার উন্নতি হচ্ছে। শনিবার চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। যা আগের দিনের চেয়ে ১ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়েছে। তবে তাপমাত্রা বাড়লেও প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহের কারণে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। তারা জানিয়েছে, কুয়াশা বাড়ছে, তাই আজ থেকে শীত পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হতে পারে। তবে সার্বিকভাবে ডিসেম্বর মাসজুড়েই শীতের অনুভূতি থাকবে।
এদিকে, শীতের তীব্রতা থেকে হতদরিদ্র, দুস্থ, অসহায়, ছিন্নমূল মানুষদের উষ্ণতা দিতে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম অব্যহত রেখেছে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
দামুড়হুদা:
দামুড়হুদায় হঠাৎ করে দুইদিন দমকা হাওয়া প্রবাহিত হওয়ায় শীতের প্রকোপ বেড়ে গেছে। গতকাল শনিবার জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল দামুড়হুদায়। এদিন বেলা বাড়লেও শীতের তীব্রতা কমেনি। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গায় ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে বলে চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা যায়। ভোর থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের দেখা মিললেও নেই কোনো উত্তাপ। শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া ও বৃদ্ধ মানুষ। তাঁরা নিত্যদিন কোনো কাজ পাচ্ছেন না। এছাড়া সাধারণ মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। ছিন্নমূল মানুষ খড়কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উপস্থিতির হার কমে গেছে। সকালে যাত্রী কম হওয়ায় যাত্রীবাহী বাসগুলোও দেরিতে গন্তেব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে।
দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল শুভ জানান, হঠাৎ করে তীব্র শীত অনুভূত হওয়ায় বৃদ্ধ ও শিশুরা শ্বাসকষ্ট এবং পাতলা পায়খানাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত হাসপাতালের বিছানা বাদে ২৫-৩০জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে, যা আরও বাড়বে।
দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘হঠাৎ করে শীত অনুভূত হওয়ায় বোরো বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হতে পারে। বোরো বীজতলা হুলুদ ও মরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে ভয়ের কিছু নেই, কৃষক ভাইদের কিছু করণীয় আছে। বোরো বীজতলা দিনের বেলায় পলিথিন কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে এবং রাতে পলিথিন সরিয়ে ফেলতে হবে। বিকেলে পানি দিতে হবে, সকালে পানি বের করে দিতে হবে। আর একটা কাজ করতে পারেন, সকালে শিশিরগুলি দড়ি টেনে ফেলে দিতে হবে। বোরো বীজতলা হুলুদ হলে শতকে ২৫০ গ্রাম করে ইউরিয়া দিতে হবে। তবে শীতজনিত অন্য ফসলের ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা নেই।’
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের আবহাওয়া পর্যবেক্ষক তহমিনা নাসরিন জানান, গতকাল শনিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। বাতাসের গতির বেগ ঘণ্টায় ৬ থেকে ৯ কিলোমিটার। কয়েকদিন পর চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা আরও কমে আসতে পারে বলে জানান তিনি।
দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুনিম লিংকন জানান, দামুড়হুদা শীতার্ত মানুষের জন্য ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে চার হাজার কম্বল এসেছে। যা দামুড়হুদা উপজেলায় শীতার্ত মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে গত দুইদিন থেকে শীতের মাত্রা আরও বেড়েছে। প্রচণ্ড শীতের পর এবার শুরু হয়েছে শৈত্যপ্রবাহ। গতকাল শনিবার সূর্যের মুখ দেখা যায়নি এবং ভোর থেকে কুয়াশা পড়া অব্যাহত রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এদিকে, তীব্র শীতে জনজীবন হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে খেটে মানুষরা পড়েছে বেশি বিপদে। তীব্র শীতে কাজ না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছেন দিনমজুরেরা। গ্রামগঞ্জ থেকে কাজের সন্ধানে মেহেরপুর শহরে আসা দিন মজুরের সংখ্যাও গত কয়েকদিনে ছিল অনেক কম। অপর দিকে, তীব্র শীতের প্রকোপ থেকে রেহাই পেতে সাধারণ মানুষ গরম কাপড় কিনতে ভিড় জমাচ্ছেন দোকানগুলোতে। বিশেষ করে ফুটপাতে পুরাতন কাপড়ের দোকনগুলোতে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা এসব পুরাতন কাপড়ের দোকান থেকে সংগ্রহ করছেন শীত নিবারণের গরম পোশাক। এছাড়াও গ্রাম ও শহরের ওলি-গলিতে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা গেছে অনেককের। মেহেরপুর জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে গরীব ও অসহায় মানুষদের দেওয়া হচ্ছে কম্বল। এদিকে, হঠাৎ করে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা। গত দুই দিনে প্রায় শ’খানেক রোগী ভর্তি হয়েছেন আবহাওয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে। মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গার আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, শীতের তীব্রতা আরও বেশি হতে পারে। এ ছাড়াও চলতি মাসেই একটি শৈত্যপ্রবাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গনি জানান, ‘আমরা ইতিমধ্যে গরীব ও অসহায় ব্যক্তিদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করেছি। আমাদের কাছে এখন পর্যাপ্ত কম্বল সংরক্ষিত আছে। সেগুলো বিতরণ করা হবে।’
আমঝুপি:
মেহেরপুরে তীব্র শীতে দুই বৃদ্ধার হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোরের দিকে মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি উত্তর পাড়ায় ওই দুই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়। জানা যায়, শনিবার ভোর চারটার দিকে সদর উপজেলার আমঝুপি উত্তর পাড়ার ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেনের মা ও মৃত ফকির শেখের স্ত্রী জহুরা খাতুন তীব্র শীতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ১ শ বছর। মরহুমার দুই ছেলে, পাঁচ মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এদিকে, একই দিন ভোরে পাঁচটার দিকে পার্শ্ববর্তী আমঝুপি উত্তর পাড়ার মুদি ব্যবসায়ী ইসাহক আলী মা ও মৃত দাউদ আলীর স্ত্রী জয়নক খাতুন মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। মরহুমার দুই ছেলে, তিন মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
ঝিনাইদহ:
তীব্র শীত কাটানোর প্রস্তুতি বা অভ্যস্ত নেই ঝিনাইদহের মানুষের। ফলে প্রচণ্ড শীতে কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ। ধনী, গরীব ও মধ্যবিত্ত সবারই একই দশা। গত ৩-৪ দিনে ঝিনাইদহে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। উত্তরের হিমেল হাওয়ার পর হঠাৎ করেই শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। শীত বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক কাজকর্ম কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে। ভোরে কাজে বের হতে গিয়ে সবচেয়ে বিপাকে পড়ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। আগুন জ্বালিয়ে অনেকেই চেষ্টা করছেন শীত নিবারণের। সকালের দিকে পথঘাট কুয়াশার চাঁদরে ঢেকে থাকায় হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। শীতের কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন শ্রমজীবী, পথচারী থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ। বিশেষ করে মৃদু বাতাস দুর্ভোগের মাত্রাটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। শৈলকুপার কৃষক দবির উদ্দিন বলেন, ‘সকালে মাঠে কাজ করতে যেতে পারছি না। শীতের সঙ্গে বাতাসে শরীরে কাপুনি উঠে যাচ্ছে। এজন্য অনেক বেলা পর্যন্ত বাড়িতেই বসে থাকতে হচ্ছে।’ ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ জানান, ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের শীত নিবারণের জন্য জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গভীর রাত ও দিনের বিভিন্ন সময় কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে।
কমেন্ট বক্স