মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

৩ কৌশলে জামায়াতে দৃঢ়ভাব

  • আপলোড তারিখঃ ৩১-১০-২০১৯ ইং
৩ কৌশলে জামায়াতে দৃঢ়ভাব
সমীকরণ প্রতিবেদন: শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে গিয়ে ভরাডুবির পর তিন কৌশল গ্রহণ করেছে জামায়াতে ইসলামী। একদিকে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতা, অন্যদিকে বিএনপিকে সঙ্গ দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত। জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলটি তিনটি কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রথমত, ৪৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়েছে, নীরব থেকে দীর্ঘ এই সময়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে, দ্বিতীয়ত, টিকে থাকার কৌশলের অংশ হিসেবে সরকারের সঙ্গেও দলটির সমঝোতা হয়েছে। ‘ডোন্ট ডিস্ট্রাব নীতি’ গ্রহণ করা হয়েছে। অতীতে প্রকাশ্যে সরকার এবং ভারত বিরোধী হয়ে আক্রোশ প্রকাশ করলেও এখন থেকে সেটি আর করা হবে না। তৃতীয়ত, ক্ষমতাসীনদের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা। বিএনপি ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনগণ ও দল থেকে দূরে সরে যাওয়ায় বিএনপির জনপ্রিয়তা লুফে নিতে লাভে-লোভের দলটি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ কৌশলের মাধ্যমে দলটি দৃঢ়ভাব হয়ে উঠছে। এর আগে জামায়াতের আমিরসহ শীর্ষ পাঁচ নেতার ফাঁসি ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় দলের গুরু অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর পর এটিএম আজহারের ব্যাপারে ভিন্নসূর তৈরি হয়েছে। হঠাৎ করে দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেনম আজহারের ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্ধান্তে আসবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের এক নেতা বলেন, নির্বাচনের পর প্রথম সপ্তাহে ঘোষণা দিয়ে জামায়াত নামক কোনো দল না থাকার ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিলো। গণমাধ্যমকে জানানোর কথা ছিলো, তারা আর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না। জামায়াত নামক কোনো দলে তাঁরা আর থাকবে না। কিন্তু দলের সংবিধান ও গঠনতন্ত্রে কিছু জটিলতা থাকায় এগুলোকে সংশোধনে আনার প্রক্রিয়া চলছে। আবার বড় একটি অংশ থেকে আপত্তিও আসছে ঝুঁকি থাকলেও জামায়াত নামক দলেই টিকে থাকতে। ওই নেতার দাবি, দল না থাকার ঘোষণা দিলেও আমিরের পদত্যাগের বিধান জামায়াতের গঠনতন্ত্রে নেই। ৬৪, ৬৫, ৬৬, ৬৭ নাম্বার ধারাগুলোতে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে আমিরের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কতটুকু। এ ছাড়াও দীর্ঘ বছরের রাজনীতিতে নামে-বেনামে রয়েছে বহু সম্পদ! দল না থাকলে এগুলোর সংরক্ষণ নিয়েও দলে বড় প্রশ্ন রয়েছে। তাই নীরবতার কৌশল বেঁচে নেয়া হয়েছে। জানা যায়, আপাতত জামায়াত তাদের সাংগঠনিক শক্তি মজবুতে মনোযোগ দিচ্ছে। টার্গেট ভিত্তিক ভিশন বাস্তবায়ন করবে। ইতোমধ্যে ৪৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। রাজনীতির মাঠ থেকে নিজেদেরকে পুরোপুরি গুটিয়ে আগামী এই ৪৫ বছর শুধু সামাজিক কাজ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দল এগিয়ে নিতে তৎপর থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ১২ বছর রাজনীতির মাঠে কঠিন সময় পার করছে জামায়াত। কলঙ্কের দায়ে হারাতে হয়েছে দলের শীর্ষ নেতাদের। যদিও বিএনপির নেতৃত্বে জোটে ২০ বছর থেকেও কঠিন সময়ে তাদেরও পাশে পাওয়া যায়নি। জামায়াতের ফাঁসির দ-প্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে বিএনপির কেউ মুখ খুলেনি। বিএনপির প্রতি সেই রাজনৈতিক ক্ষোভ এখনো দলটির রয়েছে। তাই যেমনি দলটি আওয়ামী লীগের উপর ক্ষোভ তেমনি বিএনপির ওপরও। এখন ভিশন বাস্তবায়নে জামায়াত রাজনৈতিক কৌশলে চলছে। তবে সামপ্রতিক জামায়াতের গতিবিধি নিয়ে বিএনপির মধ্যে বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে। জামায়াত নির্বাচনে না গিয়ে হারিয়ে গেলে বিএনপির লাভ-ক্ষতি কী হবে? বিএনপির অনেকে মনে করছেন, এতে ক্ষতির দিকই বেশি। জামায়াত এই সরকারের অধিনে আর নির্বাচনে না গিয়ে দীর্ঘ সময় হারিয়ে থেকে অদৃশ্যভাবে যে কর্ম করবে এবং সাংগঠনিক রূপ নিয়ে কোনো সময় মাঠে এলে বিএনপি-জামায়াতকে মোকাবিলা করাই কষ্ট হয়ে যাবে। এখনো জামায়াতের যে সাংগঠনিক অবস্থা, দলীয় শৃঙ্খলা আছে তা বিএনপির মাঝে নেই। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২০ দল থেকে যে পরামর্শ আসে তাতে জামায়াতের পরামর্শই বেশি অগ্রাধিকার পায়। বিএনপি মনে করে, জামায়াতের কথা একক ব্যক্তির নয়, পুরো দলের। আর ২০ দলীয় জোটের অন্য সদস্যদের কথা ব্যক্তিগতই বেশি। তবে বিএনপির অন্য একটি সূত্রের দাবি, বিজেপি এবং কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিএনপিকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে, ভারতের আস্থা অর্জন করতে হলে বিএনপিকে অবশ্যই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়তে হবে। যে দাবি দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও করে আসছে। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীকে জোটে রাখায় বহুদিন থেকে বিএনপি ভারতসহ আন্তর্জাতিক দেশগুলোর চাপে আছে। দেশের বামপন্থি বুদ্ধিজীবীরাও বিএনপি থেকে দূরে রয়েছে। আদর্শিক অনেক দলীয় নেতাকর্মীও জামায়াতকে জোটে রাখায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। সেই কৌশলে জামায়াতকে দূরে রাখা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে জানা যায়, ক্ষমতাসীনদের অধীনে উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ধানের শীষে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ভেতরে ভেতরে প্রার্থীও চূড়ান্ত করছে। যদিও অতীতে সকল নির্বাচনে দল-জোটের পক্ষ থেকে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা দিতে নানা পদক্ষেপ দেখা গেলেও এবার উপজেলা নির্বাচনে তাদের চূড়ান্ত নীরবতা। এ নিয়ে চিন্তিত বিএনপি। দলটির গতিবিধিতে নজর রাখা এমন বুদ্ধিজীবীদের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর ডিগবাজি, নীরবতা এবং লোভে-লাভের হিসাবটা রাজনীতিতে আদর্শগত চরিত্র। বিএনপি জোটে থেকেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে লাভের হিসাবের খাতা খুলেছিল। তাদের সব কিছুতে থাকে রাজনৈতিক বড় হিসেব। এবার নীরবতায়ও তাদের বড় স্বার্থ রয়েছে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদসহ অনেক শীর্ষ নেতাই হঠাৎ করে মুক্তি পান। এ নিয়ে বিএনপির বড় একটি অংশের সন্দেহ রয়েছে, সরকারের সঙ্গে জামায়াতের কোনো গোপন যোগাযোগ রয়েছে কিনা। কেন না সরকার রাজনীতিতে তাদের নিয়ে প্রশ্ন তুললেও দলটিকে নিষিদ্ধ করেন না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণার পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্তই বলা যায়। অপ্রত্যাশিত কিছু না ঘটলে উত্তরে তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণে ইশরাক হোসেন হবেন। দলের নীতিনির্ধারণী সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। নগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন ও সহসভাপতি আবু সুফিয়ানের মধ্যে একজন প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এই আসনগুলোতে অতীতে তাদের প্রার্থী প্রস্তাবনা করলেও এবার কিছুই বলছেন না। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ২০-দলীয় জোট মূলত নির্বাচনি জোট। নির্বাচন ঘিরে তাদের জোটভুক্ত কার্যক্রম হয়। যেহেতু এখন কোনো নির্বাচনে কেউ যাচ্ছে না, তাই জামায়াত নিজেদের দলের ব্যাপারে প্রাধান্য দিচ্ছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, ‘জাতীয় ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে। যে জাতীয় প্রয়োজনকে সামনে রেখে ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে সেই প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বরং সে প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে। ১৯৯১ সালে জামায়াত তার নিজ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমর্থন দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছি। দেশ ও জাতির স্বার্থে এ ধরনের সমর্থন এবং উদারতা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।’ এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামগীরের ভাষ্য, ‘বিএনপি ১৯৯১ সালের নির্বাচন একাই করেছে এবং সরকার গঠন করেছে। সুতরাং বিএনপির জেতার জন্য কারো ওপর নির্ভর করতে হয় না, বিএনপি সেলফ সাফিশিয়েন্ট জেতার জন্য।’ তবে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। জামায়াত আপাতত এই সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না।’ এছাড়া আজ বৃহস্পতিবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদ-ের বিরুদ্ধে করা আপিলের রায় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক শীর্ষ নেতারই ফাঁসি হয়েছে তবে এটিএম আজহারুল ইসলামের ব্যাপারে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, চূড়ান্ত রায় হয়তো বহাল থাকবে না। কেননা, এক সাক্ষী বলেছেন, তিনি এটিএম আজহারকে ৬০ কিলোমিটার দূর থেকে দেখেছেন, আরেক সাক্ষী বলেছেন, তিন কিলোমিটার দূর থেকে দেখেছেন, আর এক নারীর ব্যাপারে বলা হয়েছে— তিনি ওই সময়ে কুমারী ছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি কুমারী ছিলেন না, সন্তানের জননী ছিলেন। এ সব বিষয়ের ব্যাপার বিশ্লেষণ করে দৃঢ় বিশ্বাস করি, আমাদের পক্ষেই রায় হবে।’


কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী