চুয়াডাঙ্গায় জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক ও এপিপি অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলামকে উপর্যুপরি কুপিয়ে জখম, ঢাকায় রেফার্ড
হামলাকারীরা যত শক্তিশালীই হোক, গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে : পুলিশ সুপার জাহিদ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাড. শফিকুল ইসলাম শফিকে (৫৫) ফিল্মি স্টাইলে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল শনিবার শহরের রেলবাজার জনতা ব্যাংক ভবনের নিচে এ ঘটনা ঘটে। হামলার একপর্যায়ে অ্যাড. শফিকুল ইসলাম শফি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা অস্ত্রোপচারের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় রেফার্ড করেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা। এ ঘটনার পর চুয়াডাঙ্গা শহরজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং শহরের ব্যবসায়ীরা দ্রুত তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে ঘরে ফিরে যান। কিছুক্ষণের মধ্যে আতঙ্কগ্রস্ত পুরো শহরে সুনসান নীরবতা নেমে আসে। ঘটনার পর থেকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশ চেকপোস্ট বসায় এবং অপরাধীদের ধরতে শুরু করে সাঁড়াশি অভিযান। রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক সাতজনের মধ্যে চারজনকে অ্যাড. শফিকে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ কারও নাম উল্লেখ করেনি।
জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাড. শফিকুল ইসলাম শফির ওপর হামলার প্রতিবাদে রাতেই চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা। পরে বিক্ষোভ মিছিলটি চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারের শহীদ হাসান চত্বরে (চৌরাস্তার মোড়) সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস, সদর উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কবির, চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মতিয়ার রহমান মতি, সদর উপজেলা কৃষক লীগের আহ্বায়ক আব্দুল মতিন দুদু, পৌর কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আরিফ, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জানিফ, জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন জ্যাকিসহ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা।

এ ঘটনার পর চুয়াডাঙ্গার নবাগত পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম অপরাধীদের ধরতে পুলিশের সব ইউনিটকে কড়া নির্দেশনা দেন। পুলিশ সুপারের নির্দেশনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জিহাদ খানকে সারা রাত ফোর্স নিয়ে অপরাধীদের আটক ও প্রকৃত ঘটনা উন্মোচনে বিশেষ তৎপর থাকতে দেখা গেছে। এ ছাড়া পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট সারা শহরজুড়ে এক নিরাপত্তা-বলয় সৃষ্টি করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার রাতে শহরের আলিয়া মাদ্রাসা-সংলগ্ন মসজিদে এশার নামাজ আদায় শেষে রেলবাজার শাখা জনতা ব্যাংক ভবনের নিচে বসে গল্প করছিলেন অ্যাড. শফিকুল ইসলাম শফি। এ সময় হঠাৎ তিনটি মোটরসাইকেলে ৬-৭ জন দুর্বৃত্ত জনতা ব্যাংক ভবনের সামনে আসে এবং তাদের মোটরসাইকেলগুলো স্টার্টে রেখে অ্যাড. শফিকুল ইসলাম শফির ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে এলোপাতাড়ি কুপাতে থাকে। একপর্যায়ে অ্যাড. শফি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা মৃত ভেবে তিনটি মোটরসাইকেলযোগে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে। ঘটনার পরপরই রেলবাজার জনশূন্য হয়ে যায়। পরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি রক্তাক্ত অবস্থায় গুরুতর জখম যুবলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাড. শফিকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।
খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ, সদর থানার ওসি আবু জিহাদ খান, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দার জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাড. শফিকুল ইসলাম শফিকে দেখতে সদর হাসপাতালে ছুটে আসেন। এ সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, সেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাসহ অ্যাড. শফির সহকর্মীরা হাসপাতালে ছুটে আসেন।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সার্জারি কনসালট্যান্ট ডা. ওয়ালিউর রহমান নয়ন জানান, ‘ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি কোপে অ্যাড. শফির পিঠ, ঘাড় ও পেট মারাত্মক জখম হয়েছে। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার ভুঁড়ি বের হয়ে গেছে। আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা অস্ত্রোপচারের পর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস দাবি করেন, দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা চিহ্নিত সন্ত্রাসীরাই এ হামলা চালিয়েছে। হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিও জানান তিনি।
চুয়াডাঙ্গা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক ও পৌরসভার মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু হামলাকারীদের চিহ্নিত সন্ত্রাসী দাবি করে তাঁদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, হামলা করে চুয়াডাঙ্গাতে আর রাজনীতি করা যাবে না। একজন রাজনীতিবিদকে ইঙ্গিত করে মেয়র আরও বলেন, ‘তাঁকে সাপোর্ট করে না বিধায় আমাদের লোকজনের ওপর এ হামলা চালানো হয়েছে।’ তিনি হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আরও বলেন, অ্যাড. শফিকুল ইসলাম শফি জেলা ছাত্রলীগ, জেলা যুবলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের জন্য এই মানুষটার অনেক অবদান রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জিহাদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রুপিংয়ের কারণে এ হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। একজন মাননীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কটূক্তি করার প্রতিবাদে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। এ ঘটনার পর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং অপরাধীদের ধরতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’ হামলার ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল বলেও সময়ের সমীকরণকে ওসি জানান।
চুয়াডাঙ্গা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ বলেন, ‘পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। এ ঘটনায় কেউ পার পাবে না। প্রকৃত অপরাধীদের আটক করে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচন করা হবে।’
চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শফির ওপর যারা হামলা করেছে, তারা যত শক্তিশালীই হোক, তাঁদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে আমার হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছি। তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।’