অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিকের উদ্যোগ থমকে
- আপলোড তারিখঃ
২৩-০৮-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
‘জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০’-এ অন্যতম সুপারিশ ছিল প্রাথমিক স্তর পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করাসহ তিন স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা চালু। এতে বলা হয়েছে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক ও এর পরবর্তী স্তর হবে উচ্চশিক্ষা। ১৯৭৪ সালের ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের আলোকেই এটি করা হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষানীতি প্রণয়নের নয় বছর পরও এর বাস্তবায়ন হয়নি। তিন বছর আগে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর উন্নীতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা থমকে আছে। ফলে বাকি দুই স্তর বাস্তবায়নও আটকে গেছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পাশাপাশি মানও বাড়বে। অথচ এটি বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা তুলে দিতে বিভিন্ন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীতের উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়নের অনুমতি চেয়ে একই বছরের জুনে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব পাঠায় দুই মন্ত্রণালয়। কিন্তু এটি বাস্তবায়নে তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকায় ওই মাসের ২৭ তারিখ মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার তা নেই। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও মেরামত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সুরাহা, শিক্ষার্থী স্থানান্তর প্রক্রিয়া, বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়, আসবাব ও শিক্ষা উপকরণের বিষয়ে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণেই শিক্ষানীতির এই সুপারিশ বাস্তবায়ন মন্ত্রিসভা আটকে দিয়েছে। তবে দুই মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০০৯ সালে চালু হয় পিইসি পরীক্ষা। এরপর থেকে পড়াশোনার চাপে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে পরীক্ষাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। এ জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন অভিভাবকরা। অন্যদিকে পরীক্ষাটি চালু রাখার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকবার বক্তব্য দিয়েছেন। অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষানীতির আলোকে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হলে নিয়মানুযায়ী পঞ্চম শ্রেণিতে পিইসি পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে। অষ্টম শ্রেণিতে জেএসসি পরীক্ষা কোন পদ্ধতিতে হবে তা নিয়েও সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। মূলত সরকার চায় না পিইসি পরীক্ষা বাতিল হোক, আর এ কারণেই প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করছে না।
শিক্ষাবিদদের মতে, এক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়; পরে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তে গেলে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়। আর এ কারণে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পড়েই অনেকে বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হলে তাদের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে ধরে রাখা সম্ভব হবে। আর এ কারণেই ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এটি এখনো আটকে আছে মন্ত্রণালয়ের কমিটি ও উপকমিটির সভার মধ্যেই।
এ বিষয়ে ‘গণসাক্ষরতা অভিযানের’ নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘সরকারের চেষ্টার অভাব রয়েছে। আমরা বলেছিলাম, অন্তত পাইলট সিস্টেমে অল্প অল্প স্কুলকে এই স্তরে দেওয়া হোক। ব্যানবেইসের হিসাব মতে, দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ স্কুলকে এখনই প্রাথমিক স্তরে (অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত) নেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেটা সরকার কেন করছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’ এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘প্রাথমিক স্তরে এখন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার খুবই কম। এটা সম্ভব হয়েছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করার কারণেই। যদি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা উন্নীত হয় এবং এটিও বাধ্যতামূলক থাকে তাহলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঝরে পড়ার হারও কমে আসবে। এ ছাড়া শিক্ষার মানও বৃদ্ধি পাবে।’ জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। আমি কিছু বলতে পারব না। এটি আগের স্থানেই রয়েছে; কোনো পরিবর্তন হয়নি। কীভাবে হবে, কবে হবে এ বিষয়েও আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘শিক্ষানীতি কোনো আইন নয়, এটি একটি সুপারিশ। ফলে আমরাও চাই এই সুপারিশগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে। একে একে সেগুলো হচ্ছেও। তিন স্তরবিশিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে প্রথম স্তর প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করতে দুই মন্ত্রণালয় উদ্যোগও নিয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো প্রস্তুত নয় বলে দুই বছর আগেই তারা জানিয়েছিল। ফলে মন্ত্রিসভাও এ বিষয়ে আপত্তি দিয়েছিল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রস্তুত হওয়ার জন্য আহ্বান করেছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি আছে। আমি যতদূর জানি কমিটি কাজ করছে। আশা করি, দ্রুতই এ বিষয়টি বাস্তবায়ন হবে।’ আর এটি বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং শিক্ষার মানও বৃদ্ধি পাবে বলে জানান শিক্ষা সচিব।
কমেন্ট বক্স