শিক্ষককে ফাঁসাতে আবির হুসাইনকে হত্যা করা হয়
- আপলোড তারিখঃ
০৬-০৮-২০১৯
ইং
কয়রাডাঙ্গায় মাদ্রাসাছাত্র হত্যার ঘটনা : ১৬৪ ধারায় আনিস-ছালিমির-রাতুলের জবানবন্দি
বিশেষ প্রতিবেদক:
আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা নূরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র আবির হুসাইন হত্যাকা- মামলার মূল রহস্য অবশেষে উন্মোচিত হয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষক তামিম বিন ইউসুফ ওরফে তামিমে দাড়ির অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে আবিরকে গলাকেটে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন ওই মাদ্রাসারই ছাত্র আনিসুজ্জামান (১৮)। তিনি সদর উপজেলার হানুরবাড়াদি গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে। একই মামলায় টেইপুরের আব্দুল হাই কাতুর ছেলে ছালিমির হোসেন (১৩), আকুন্দবাড়িয়ার আবুল কালামের ছেলে আবু হানিফ রাতুল (১৩) ও মামুন হোসেনের ছেলে আব্দুর নুর (১২) এবং বলদিয়া গ্রামের বিল্লাল হোসেনের ছেলে মুনায়েম হোসেন (১৬) চুয়াডাঙ্গা আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাজেদুর রহমানের নিকট ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। গতকাল সোমবার বিকেলে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের আদালতে হাজির করা হলে সন্ধ্যায় জবানবন্দি রেকর্ড শেষে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়, কোর্টসূত্রে এ তথ্য পাওয়া যায়।
হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী মাদ্রাসার ছাত্র আনিসুজ্জামান তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘তামিম হুজুর আমাদের ওপর খুব অত্যাচার করত। কারণে-অকারণে আমাদের বেত দিয়ে মারত, বিদ্যুৎ চলে গেলে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করাত। এরই একপর্যায়ে আমি (আনিস), ছালিমির ও রাতুল মিলে পরিকল্পনা করি, তামিম হুজুরকে মেরে ফেলতে হবে। আবিরকে মারার আগে হুজুরকে মারার পরিকল্পনা ছিল। এরপর আমরা মাদ্রাসা থেকেই একটি ধারালো ছুরি ও একটি রড নিই। সে মোতাবেক আমরা হুজুরকে মারার জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করি, কিন্তু মারতে পারিনি। এরপর ঠিক করি, তামিম হুজুরকে যখন মারা গেলো না, তখন হুজুর যাকে নিয়ে এসেছে, সেই আবিরকে মারব। আমরা ভেবেছিলাম, আবিরকে মারলে ওর বাবা-মা হুজুরকে সন্দেহ করবে এবং তামিম হুজুর ফেঁসে যাবে। রোববার (২১ জুলাই) রাতে আমি ও মুনায়েম আবিরকে নিয়ে মাদ্রাসার পাশের বাগানে কাঁঠাল খেতে যায়। কিন্তু ভালো কাঁঠাল না পেয়ে ফিরে আসি। এ সময় আমি মুনায়েমকে বলি, তুই একটু দাঁড়া, আমি আবিরের সঙ্গে খারাপ কাজ করব। প্রথমে আবিরকে প্রস্তাব দিলে সে রাজি হয়নি, পরে রাজি হলে তার সঙ্গে খারাপ কাজ করি। পরিকল্পনা অনুযায়ী মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) মাদ্রাসার খড়ির গাদায় একটি ধারালো ছুরি ও রড লুকিয়ে রাখি। ওই রাতে সবাই এশার নামাজে গেলে আমি আবিরকে বলি, চল কাঁঠাল খেতে যেতে হবে। আমার কথায় আবির রাজি হয়। তারপর ওকে নিয়ে আমি কাঠালবাগানে যায়। ওখানে আগে থেকে আব্দুর নুর, রাতুল ও ছালিমির অপেক্ষা করছিল, মুনায়েম লজিং খেতে চলে যায়। আবিরকে সঙ্গে করে আমবাগানে নিয়ে যাওয়ার সময় আব্দুর নুর পিছন থেকে পালিয়ে যায়। আমবাগানে পৌঁছে আমি আবিরের গলা ধরে পেড়ে ফেলি। ছালিমির ও রাতুল পা ধরে। তারপর আমি আমার ঘাড়ে থাকা তোয়ালে দিয়ে আবিরের গলায় ফাঁস দিয়ে তাকে মেরে ফেলি। তারপর লাশ টেনে আমরা বাগানের একপাশে নিয়ে যায়। ছালিমির আবিরকে জবাই করে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে। এরপর তোয়ালে দিয়ে মাথাটা বেঁধে পাশের পুকুরের মধ্যে ফেলি। ওই পুকুরেই ফেলে দেওয়া হয় হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ছুরিটিও। আর তোয়ালে আমার কাছে ছিল। তোয়ালেটা ছালিমিরের কাছে রেখে হাতমুখ ধুয়ে আমি ছাত্রদের খেতে দিতে চলে যায়। মুনায়েম লজিং খেয়ে ফিরে এসে ছালিমিরের কাছ থেকে তোয়ালেটা নিয়ে মাদ্রাসার খড়ির গাদার নিচে লুকিয়ে রাখে।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর আব্দুল খালেকের জানতে চাইলে তিনি জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত রোববার রাতে কয়রাডাঙ্গা নূরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার হানুড়বাড়াদি গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে আনিসুজ্জামান, টেইপুর গ্রামের আব্দুল হাই কাতুর ছেলে ছালিমির হোসেন, আকুন্দবাড়িয়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে আবু হানিফ রাতুল, মামুন হোসেনের ছেলে আব্দুর নুর ও বলদিয়া গ্রামের বিল্লাল হোসেনের ছেলে মুনায়েম হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তারা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে মাদ্রাসাছাত্র আবির হুসাইনকে হত্যার কথা স্বীকার করে।
প্রসঙ্গত, গত ২৪ জুলাই বুধবার সকালে আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের নূরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার পার্শ্ববর্তী একটি আমবাগান থেকে মাদ্রাসাছাত্র আবির হুসাইনের মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মাথা উদ্ধারে র্যাব হেড কোয়াটার্সের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুটি কুকুর দিয়ে ঘটনাস্থল ও তার আশপাশ এলাকায় সুইপিং করানো হয়। ডগ স্কোয়াডের সূত্র ধরেই ধারণা করা হয়, ঘটনাস্থলের ৩৫-৪০ গজ দূরে থাকা বিশালাকার ওই পুকুরটিতে কাটা মাথাটি ছুড়ে ফেলা হতে পারে। এরপর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দলের সদস্যরা পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে পুকুরটির উত্তর-পূর্ব কোনায় পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় মাথাটি খুঁজে পান। উদ্ধার হওয়া মাথাটি কিনারে তোলা হলে স্থানীয় ব্যক্তিরা ও মাদ্রাসার সভাপতি হাজি ইয়ামিন আলী বিশ্বাস এটি মাদ্রাসাছাত্র আবিরের মাথা বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহত আবির হুসাইনের মা গোলাপী বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করেন। এরপর মাদ্রাসার সুপার হাফেজ মাওলানা মুফতি মো. আবু হানিফ ও শিক্ষক তামিম বিন ইউসুফ ওরফে তামিমে দাড়িকে উক্ত মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে আটক দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ। পুলিশ হত্যাকা-ের এক সপ্তাহের মাথায় সুপার আবু হানিফ ও শিক্ষক তামিমে দাড়িকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। এরই একপর্যায়ে মাদ্রাসার সন্দিগ্ধ পাঁচ ছাত্রকে আটক করা হয় এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে এ মূল রহস্য বেরিয়ে আসে।
কমেন্ট বক্স