সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ ঈদে

  • আপলোড তারিখঃ ০৪-০৮-২০১৯ ইং
আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ ঈদে
সমীকরণ প্রতিবেদন: রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও রোগী বেড়েছে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায়। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই এসব জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গড়ে প্রতিদিন সাড়ে পাঁচশ’র মতো আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল শনিবার ঢাকার বাইরে ৬৮০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এই অবস্থায় ঈদের ছুটিতে ডেঙ্গু চিকিৎসা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশের সব জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৮ বছরের মধ্যে আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে গত ২৭ জুলাই। সেদিন এ মৌসুমে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫২৮ জন। গতকাল এ সংখ্যা পৌঁছেছে ২২ হাজার ৯১৯ জনে। পাশাপাশি এ বছর ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে দেশে। এর আগের বছর পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ দু’তিনটি জেলায় ডেঙ্গু মৌসুমে হাতেগোনা কিছু রোগী পাওয়া যেত। এবার গতকাল পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৯০৫ জন। এ সংখ্যা দেশে এই প্রথম। এমন পরিস্থিতিতে এবার ঈদের সময় ডেঙ্গু উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ১২ আগস্ট ঈদুল আজহা। ইতিমধ্যেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঢাকার বাইরে আক্রান্তের সংখ্যাও। ঈদের মূল ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামে যাবে। এদের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যেমন থাকবে, তেমনি জ¦র নিয়ে যাওয়া রোগীদের মাঝেও ডেঙ্গু দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এসব মানুষ ঈদে গ্রামে গেলে ডেঙ্গুর ভাইরাস সারা দেশে আরও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবে সরকার, আক্রান্তদের চিকিৎসায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এ নিয়ে চিন্তায় পড়েছে দেশের মানুষ। বিশেষ করে দেশের ১৭ জেলায় এবার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। জেলাগুলো হলো- কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, জামালপুর, ফেনী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুষ্টিয়া, বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, সিলেট সদর ও মৌলভীবাজার। এসব জেলায় গড়ে শতাধিক রোগী আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব জেলায় ডেঙ্গুর চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা গেছে। ঈদে পরিস্থিতি সামাল দিতে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি দেশের সব পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করেছে সরকার। গতকাল শনিবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. এরশাদুল হক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে আরও বলা হয়েছে, এরই মধ্যে ছুটিতে গমনকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্ব-উদ্যোগে কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। ঈদের সময় ডেঙ্গুতে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, ঈদে ঢাকা থেকে যারা যাবেন তাদের মধ্যে ডেঙ্গু রোগী থাকবেন। আবার অনেকের শরীরে এডিসের জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থাকবে। পরে জ¦র আসবে ও ডেঙ্গু দেখা দেবে। এভাবে ভাইরাস দেশের সমস্ত অঞ্চলে নতুন করে দেখা দেবে। ঈদের সময় গ্রামে ব্যাপক জনসমাগম হওয়ায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন রোগতত্ত্ব ও কীটতত্ত্ববিদরা। এদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু ছড়াতে পারে এডিসের এমন প্রজাতি ‘এডিস এলবোপিকটাস’ মশা আগে থেকেই রয়েছে। এ মশা গ্রামের মশা। আর এডিস ইজিপটাই শহরের মশা। সুতরাং কোনো ডেঙ্গু রোগী যদি গ্রামে যায় ও ওই ব্যক্তিকে যদি এলবোপিকটসা মশা কামড়ায়, তা হলে এডিসের জীবাণু তার মধ্যে যাবে এবং ওই মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তিনিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে যাওয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা কঠিন হবে বলে মত দেন অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, আক্রান্তদের খোঁজখবর রাখা সত্যিই কঠিন। কারণ ডেঙ্গুর প্রকোপ এবার অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে ঈদের সময় কেউ গ্রামে নতুন করে আক্রান্ত হলে তার ডেঙ্গু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডেঙ্গু হলে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ঢাকা ছাড়ার আগে যানবাহনগুলোকে মশামুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ও কাভার্ড ভ্যানগুলো মশামুক্ত করে ছাড়া দরকার। এদিকে ঈদের সময় ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার বিশেষজ্ঞরা জানান, ঈদের সময় গ্রামে লোকসমাগম বাড়বে। এডিস এলবোপিকটাস মশার উপদ্রবও বাড়বে। সেখানে মশা নিধনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে এখনই ডেঙ্গু চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ঈদে রোগী বাড়লে বর্তমান ব্যবস্থাপনা দিয়ে সামলানো যাবে না। ডেঙ্গু পরীক্ষার রি-এজেন্টের অভাব রয়েছে। সবমিলে এখনই ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ না দিলে ঈদের ছুটিতে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়তে পারে। ঈদের সময় গ্রামে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে ও ডেঙ্গুর রোগীদের চিকিৎসায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছেÑ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, এটা সত্যিই কঠিন কাজ। সবচেয়ে ভালো হয় যাদের ডেঙ্গু হয়েছে, তারা যেন এবার ঈদে ঢাকার বাইরে না যান। সবার ডেঙ্গু পরীক্ষা করে যাওয়াই ভালো। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও সবাইকে রক্ত পরীক্ষা করে ঢাকা ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ঈদযাত্রায় বাস, ট্রেন, লঞ্চ, প্লেনসহ সব যানবাহন স্প্রে করে মশামুক্ত করে পাঠাতে হবে। মহাপরিচালক আরও বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তরা ঢাকার বাইরে গেলে তাদের যেন মশা না কামড়ায়, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। বাড়িতে মশারি ব্যবহার, ফুলহাতা শার্ট ও ফুলপ্যান্ট পরা, শরীরে মশা প্রতিরোধী ওষুধ ব্যবহার করা, ঘরে মশার ওষুধ ব্যবহার করা এবং নিজের বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা- এ নিয়মগুলো মানতেই হবে। মহাপরিচালক জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনালের বাস মালিক ও নৌপথের লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের বলেছি গাড়িগুলো যেন মশামুক্ত করে ছাড়া হয়। ইতিমধ্যেই কমলাপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ঈদে গ্রামে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, ঈদের ছুটিতে কোনো সমস্যা হবে না। ছুটিতে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এবার ঈদে আগের মতো চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে না। যে সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি, সেসব হাসপাতালে সবার ছুটি বন্ধ। চিকিৎসায় যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্য সব রকমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট পাঠানো হচ্ছে। শাহজালাল বিমানবন্দর, বেনাপোল, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ঈদে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষকে ঢাকা শহর না ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, দীর্ঘ পথযাত্রা ডেঙ্গু রোগীর জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। আর ঢাকার বাইরে রোগীর পরিস্থিতি হঠাৎ খারাপ হলে সঠিক ব্যবস্থাপনা না-ও হতে পারে। ঢাকার বাইরে রোগী বাড়ছে: গত শুক্রবার ৬৯১ জন ভর্তির হয়েছিল দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৬৮০ জন। সব মিলিয়ে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার ৯০৫ জন। শুক্রবার এই সংখ্যা ছিল চার হাজার ১৯০, আগের দিন বৃহস্পতিবার ছিল তিন হাজার ৪৬৪ জন। ঢাকার বাইরে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে দুই হাজার ৩৮১ জন, চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন দুই হাজার ৫২৪ জন। এখন ডেঙ্গুতে ১৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মৃতের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২১৫ জন, তাদের নিয়ে মোট চিকিৎসাধীন আছে ৪২৮ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন ডেঙ্গু রোগী ১২৯ এবং চিকিৎসাধীন ৪৩২ জন, খুলনা বিভাগে ৬৩ এবং চিকিৎসাধীন ৪০৯ জন, রংপুর বিভাগে ৫৪ জন এবং ভর্তি ২১৩ জন, রাজশাহী বিভাগে রোগী ৬৯ জন, চিকিৎসাধীন ৩২৫, বরিশাল বিভাগে ৬৭ জন এবং চিকিৎসাধীন ১৯৭ জন, সিলেট বিভাগে ৩১ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি ১০০ জন। এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন রোগী ৫২ জন এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৭৭ জন।


কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী