দেশের মানুষ কেন নির্মম হয়ে উঠছে?
- আপলোড তারিখঃ
২৬-০৭-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশে বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৮ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। গত কয়েক দিনে যেসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সবগুলো ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করায় তার ওপর চড়াও হয় মানুষ। পদ্মা সেতু তৈরির কাজে মানুষের মাথা প্রয়োজন হচ্ছে, এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেলেধরা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং গণপিটুনির ঘটনাগুলো ঘটছে। গুজবটি এতই ভয়াবহভাবে ছড়িয়েছে যে গুজব নিরসনে সেতু কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুদফায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার পরও তা সাধারণ মানুষকে সামান্য পরিমাণেও আশ্বস্ত করতে পারেনি। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার গুজবকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে গেলেও বাংলাদেশে কিন্তু গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা নতুন নয়। পরিসংখ্যান যাচাই করলে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রতিবছরই সারাদেশে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে গণপিটুনিতে। যদিও সেসব ঘটনার অধিকাংশই ছিল বিচ্ছিন্ন গণপিটুনির ঘটনা। পরিসংখ্যান বলে ২০১১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত গণপিটুনিতে দেশে প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যেগুলোর কোনোটায় ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে, আবার কোনো কোনো ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহেও পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। এ রকম প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক যে, সাধারণ মানুষ কেন তুচ্ছ কারণে পাশবিক নির্মমতায় আরেকজন মানুষ হত্যায়ও পেছপা হচ্ছে না?
মনস্তাত্ত্বিক দিক, ব্যক্তিগত ওসামাজিক জীবনে ক্ষোভ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহফুজা খানমের মতে, মানুষ তাদের ব্যক্তিগত জীবন বা সামাজিক জীবনের অপ্রাপ্তি থেকে উৎসারিত ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ পেলে হিং¯্র হয়ে উঠতে পারে। ‘মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ফ্রয়েড বলেছিলেন, সুযোগ পেলেই মানুষের ভেতরের আদিম পশুপ্রবৃত্তি বেরিয়ে আসতে চায়। ছোট্ট একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন মানুষের মধ্যে এ রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তখন বুঝতে হবে যে ওই পশুপ্রবৃত্তিটি কাজ করছে।’ তবে মাহফুজা খানম মনে করেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই এভাবে ক্রোধ উদগারের প্রবণতা বেশি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাজীব নন্দী, যিনি ভারত ও বাংলাদেশে গণপিটুনি বিষয়ক একটি গবেষণা করেছিলেন, তিনি মনে করেন মানুষের মধ্যে এই পশুপ্রবৃত্তি প্রকাশ হওয়ার প্রবণতা তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। নিজের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে রাজীব নন্দী বলেন, ‘এ ধরনের গণপিটুনির সংখ্যা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার নি¤œ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেশি ঘটে।’ উদাহরণ হিসেবে রাজীব নন্দী একটি চরএলাকায় ডাকাত সন্দেহে কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা তুলে আনেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের চর এলাকার মানুষ যে রকম মনস্তত্ত্ব নিয়ে চলে, অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে তাদের টিকে থাকতে হয়, সে রকম ক্ষেত্রে রাতের বেলা অচেনা মানুষ দেখলেই তাকে শত্র¤œ মনে করা এবং নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভয়ের বশবর্তী হয়ে তাকে আক্রমণ করা স্বাভাবিক।
সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া:
সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিনাত হুদা ওয়াহিদের মতে, সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে মানসিকতার বিভেদ তৈরি থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি একটি বড় কারণ। আমাদের দেশে একইসাথে অনেক ধরনের চিন্তাধারার মানুষ রয়েছে। পুঁজিবাদী, ভোগবাদী চিন্তা-ভাবনার পাশাপাশি যেমন কট্টর মৌলবাদী ধারণার মানুষের বসবাস, তেমনি সামন্তবাদী মানসিকতার মানুষও রয়েছে, বলেন ওয়াহিদ। কাজেই দেখা যায়, এখানে চরম রক্ষণশীল থেকে শুরু করে রক্ষণশীল, সামন্তবাদী, ঔপনিবেশিক, প্রগতিশীল থেকে চরম প্রগতিশীল পর্যন্ত সব ধরনের মানুষ বাস করে। বিভিন্ন চিন্তাধারার মানুষ পাশাপাশি থাকার কারণে একজনের কর্মকা-ের প্রতি আরেকজনের এক ধরনের নির্লিপ্ততা তৈরি হয়, যার ফলে এ ধরনের নির্মম অপরাধ সংঘটন করার পরও এর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ বা প্রতিবাদ তৈরি হয় না বলে মন্তব্য করেন ওয়াহিদ।
বিচার ব্যবস্থার ওপর অবিশ্বাস:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অনাস্থার বিষয়টি একেবারেই নতুন নয়। পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সহায়তার বদলে হয়রানি করারও অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি গণপিটুনির ঘটনার ভিডিওতেও উপস্থিতদের পুলিশ আসার আগে যতটুকু পারি মেরে নেই, কারণ পুলিশ আসলে টাকা খেয়ে ছেড়ে দেবে, এ জাতীয় কথা বলতে শোনা যায়। আইনের প্রয়োগের উদাহরণ তৈরি না হওয়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষ একত্রিতভাবে এ ধরনের অপরাধ করতে ভয় পায় না বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহফুজা খানম। বয়স কম থাকাকালীন, অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, এবং বিশেষ করে শিক্ষিত না হলে সেই ব্যক্তির কাছ থেকে বিবেকবান আচরণ কিন্তু আমরা আশা করতে পারি না। এ রকম মানুষ ছোটখাটো অপরাধ সংঘটন করে পার পেয়ে যাওয়াকে অধিকাংশ সময়ই গৌরবের বিষয় বলে মনে করে। সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর অনাস্থার কারণে সাধারণ মানুষ শুধু যে নিজেরা বিচারে উদ্যোগী হচ্ছে তাই নয়, অপরাধ সংঘটন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, কারণ তারা জানে যে এ রকম ঘটনায় তাদের বিচার করা কতটা কঠিন। বিবিসি
কমেন্ট বক্স