শুধুই তদন্ত
- আপলোড তারিখঃ
৩১-০৩-২০১৯
ইং
আগুন প্রতিরোধে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না
সমীকরণ প্রতিবেদন:
রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকা-ের কারণ খুঁজতে এরই মধ্যে আটটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার গুলশানের ডিএনসিসি কাঁচাবাজারে অগ্নিকা-ের কারণ অনুসন্ধানেও গঠিত হয়েছে একটি কমিটি। এভাবে যে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনার পর প্রথমেই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে একই ঘটনা তদন্তে একাধিক কমিটি গঠন যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে! যদিও তদন্ত শেষে কমিটির পক্ষ থেকে যেসব সুপারিশ করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলদের খুব বেশি উৎসাহ দেখা যায়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত কমিটি গঠন কি তাহলে কেবলই লোক দেখানো? বনানী ও গুলশান অগ্নিকা-ের পর এ প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সংশ্নিষ্টরা জানান, ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে আগুন লাগে। পুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় তিন শতাধিক দোকান। ওই ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি মার্কেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১১টি সুপারিশ করে। এর পর পেরিয়ে গেছে প্রায় দুই বছর। আজ অবধি একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল ফের আগুনে পুড়েছে মার্কেটটি। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে দ্বিতীয়বারের মতো অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটত না। সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্নিষ্টরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। বারবার এমন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েও তাদের জবাবদিহি করতে হয় না। শাস্তির মুখোমুখিও হতে হয় না। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। কারণ, সরকারও এর দায় এড়াতে পারে না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, কেবল ডিএনসিসি মার্কেটের ক্ষেত্রেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। আরও অনেক ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। পুরান ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডির পর তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি ঘটত না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএনসিসি মার্কেটে প্রথম দফা অগ্নিকা-ের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রবীন্দ্রশ্রী বড়ূয়াকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানতম সুপারিশ ছিল, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য অস্থায়ী দোকানের পরিবর্তে স্থায়ী আধুনিক ভবন তৈরি করা। এ ছাড়া অস্থায়ী মার্কেটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র মজুদ, দোকানিদের আগুন নেভানোর প্রশিক্ষণ প্রদান, দাহ্য পণ্য বিক্রি বন্ধসহ ১১টি সুপারিশ জমা দেয় তদন্ত কমিটি। এর একটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। স্থায়ী মার্কেট নির্মাণের সুপারিশ নিয়ে মাথা ঘামায়নি কেউ। গতকালের আগুনে অস্থায়ীভাবে তৈরি ২৯১টি দোকানের মধ্যে ২১২টিই পুড়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে ওই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বর্তমানে ডিএনসিসির সচিব পদে কর্মরত রবীন্দ্রশ্রী বড়ূয়া মন্তব্য করতে রাজি হননি। ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবদুল হামিদ মিয়া বলেন, তিনি সম্প্রতি এসেছেন। ওই মার্কেটের বিষয়টি বিস্তারিত জানেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির একজন প্রকৌশলী জানান, ডিএনসিসি মার্কেটের জায়গায় একটি বহুতল আধুনিক মার্কেট তৈরির জন্য ২০০৬ সালে মেট্রো গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি হলেও ব্যবসায়ীরা আধুনিক মার্কেট নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন। কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে এ নিয়ে কথা হলে তারা জানান, মার্কেট নির্মাণকালে তাদের ব্যবসার কী হবে, তার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিরোধিতা করেছেন। ২০১৭ সালে অগ্নিকা-ের পর ডিএনসিসির বোর্ডসভায় মেট্রো গ্রুপের সঙ্গে ডিএনসিসির চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। সেটা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে তার কোনো প্রতি-উত্তর ডিএনসিসিতে পৌঁছেনি।
এদিকে, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর ১১৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। তখন পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরসহ ২১টি দাহ্য পদার্থের বিপণন পুরান ঢাকায় বন্ধ এবং রাসায়নিক গুদামগুলোকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরসহ ১৭টি সুপারিশ করেছিল ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি। দীর্ঘ প্রায় নয় বছরে সেই সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে গত ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ভবনটিতে রাসায়নিক মজুদ থাকার কারণে আগুনের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ৭১ জনের প্রাণহানি হয় চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডিতে। কিন্তু ডিএনসিসি মার্কেটে দুবারই অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে মার্কেট বন্ধ থাকার সময় মধ্যরাতে ও ভোরে। যে কারণে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা থেকে রেহাই মেলে। চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর এ ঘটনায় গঠিত টাস্কফোর্স মাঠে নামলে রাসায়নিক গুদাম মালিকরা যত্রতত্র সরিয়ে নেওয়া শুরু করেন। ফলে এসব গুদাম অনেক আবাসিক এলাকায়ও এখন ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ায় সর্বত্রই এখন ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়াটাই প্রধান সমস্যা। এ নিয়ে কেউ ফলোআপ করে না। মিডিয়াও এসব ব্যাপার মনে রাখে না। রাজউকের দাবি, তাদের সক্ষমতা নেই। তাই বলে একের পর এক দুর্ঘটনায় এভাবে মানুষ প্রাণ দেবে? রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির উল্লেখ করে অধ্যাপক আনসারী আরও বলেন, ওই ঘটনার পর গার্মেন্ট সেক্টরে তদারকি বেড়েছে। এখন একটি গার্মেন্ট ভবন তৈরির সময় তিনটি কনসালট্যান্সি ফার্ম মনিটর করে- ফায়ার ফাইটিং, কনস্ট্রাকশন ও নকশা। এ জন্য এখন গার্মেন্টের দুর্ঘটনা কমেছে। কিন্তু অন্য দুর্ঘটনা বেড়েছে। এই দায়ভার রাজউককে নিতেই হবে। আর এবার প্রধানমন্ত্রী নিজে হাত দিয়েছেন। কাজেই এবার মনে হয় একটা রেজাল্ট পাওয়া যাবে।
সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান বলেন, এসব ব্যাপারে তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফায়ার সার্ভিসের কোনো বিচারিক ক্ষমতা নেই। ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিতে পারে। ভবন মালিক নোটিশ অনুযায়ী কাজ না করলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এরপর সিটি করপোরেশন বা রাজউকেরই দায়িত্ব ব্যবস্থা নেওয়ার।
প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, এত দিন কী হয়েছে, না হয়েছে সেদিকে যাব না। এখন প্রতিটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে। এফ আর টাওয়ার নিয়ে কমিটি হয়েছে। কমিটির রিপোর্টও প্রকাশ্যে সবাইকে দেখাব। পাশাপাশি প্রতিটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করব। এটা সবাই দেখতে পারবেন।
কমেন্ট বক্স