সমস্যায় প্রাথমিক শিক্ষা : বিস্তার বেড়েছে বাড়েনি মান
- আপলোড তারিখঃ
১৮-০৩-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
নানা সংকটে ধুঁকছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা। বিস্তার বাড়লেও প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ছে না। শিক্ষক স্বল্পতা, মানোন্নয়ন ও মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাব, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্নীতি- ইত্যাদি কারণে প্রাথমিক শিক্ষা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি বলে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছে; যা ভাবিয়ে তুলেছে সরকারকে। আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের যা শেখানো হচ্ছে তা অপর্যাপ্ত।
আর শিক্ষাবিদরা বলেছেন, গত দশ বছরে দেশে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়নি। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শিক্ষানীতি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার কথা থাকলেও কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও গাফিলতির কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষাবিদরা আরও বলেন, ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ২০০ বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও দেড় হাজার নতুন বিদ্যালয় স্থাপন করা হলেও শিক্ষা কার্যক্রম মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়নি গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। আবার গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই) থেকে একেক সময় একেক নির্দেশনা ও পরিপত্র জারি হওয়ায় বিভ্রান্তিতে পড়ছেন শিক্ষক ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা। প্রভাবশালী মহলের তদবিরকে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তা বদলি করতেই বেশি সময় ব্যয় করা হচ্ছে। এছাড়াও শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইচ্ছেমত দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করছেন বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। এতে শিক্ষকরা উচ্চতর প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
গত ১৩ মার্চ শুরু হয়েছে ‘প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৯’; চলবে ১৯ মার্চ পর্যন্ত। ‘প্রাথমিক শিক্ষার দীপ্তি উন্নত জীবনের ভিত্তি’ স্লোগানে এবার এই শিক্ষা সপ্তাহ পালন হচ্ছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে শিক্ষা সপ্তাহ পালন করা হলেও শিক্ষা ও শিক্ষকের মান বৃদ্ধিতে কর্মকর্তাদের আগ্রহ কম। ২০ থেকে ২৫ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের তেমন কোন তৎপরতা নেই। এ ব্যাপারে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি’র (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর শেখ ইকরামুল কবির বলেন, ‘যারা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনা করছেন তারা শিক্ষানীতি ধারণ করেন বলে আমার মনে হয় না। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে তাদের প্রশাসনিক প্রস্তুতিও নেই। দক্ষতারও অভাব রয়েছে। শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার কথা থাকলেও অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে কিছু স্কুলে ৮ম শ্রেণী চালু করে পিছু হটেছেন কর্তৃপক্ষ।’ ২৭ হাজার প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলেও মনিটরিংয়ের ওপর কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘কর্মকর্তারা শুধু ১০০ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করাতেই ব্যস্ত; শিক্ষার মান বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়নি, নেই শিক্ষক প্রশিক্ষণ; কারণে-অকারণে শিক্ষকদের মিছিল-মিটিংয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রমে অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না।’
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের যা শেখানো হচ্ছে তা অপর্যাপ্ত। পঞ্চম শ্রেণীর ৭৫ ভাগ শিক্ষার্থী গণিত পারে না। তৃতীয় শ্রেণীর ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে না। এর মূল কারণ হচ্ছে- শিশুর শৈশব উন্নয়ন কর্মসূচির অভাব, নি¤œমানের পাঠদান পদ্ধতি, দুর্বল বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা এবং পাবলিক শিক্ষা সামগ্রিক খরচ নি¤œস্তরের। এসব কারণে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন কয়েক বছর পেছনে পড়ে আছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে সরকারের লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের ‘লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশনস প্রমিজ ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে (২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ) বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে শিক্ষার্থীদের ১১ বছর পর্যন্ত লাগছে। যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তা মূলত সাড়ে ছয় বছরে পাওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে অন্য দেশের তুলনায় সাড়ে চার বছর পিছিয়ে থাকছে বাংলাদেশের শিশুরা। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর রবাট জে সাম বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে। এর মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু ক্লাসে যা শেখানো হচ্ছে তাতে অন্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকছে তারা। মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গরিব পরিবারের শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করছে।’
এ ব্যাপারে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী বলেছেন, ‘দশ বছরে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তৃতি ঘটেছে। এই শিক্ষার বিকাশে সরকারের আন্তরিকতাও রয়েছে। বিনামূল্যে বই দেয়া হচ্ছে, শতভাগ শিশু স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, পাস করানো হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার মান বাড়ছে না, মনিটরিং হচ্ছে না; শিক্ষকের মানও বাড়ছে না, তাদের প্রশিক্ষণও নেই।’ মনিটরিং ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পরেছে মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বদলিকে দুর্নীতির ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করছেন আমলারা। এই ফাঁদের কারণে তলানিতে নামছে প্রাথমিক শিক্ষা।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে একসঙ্গে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। এছাড়া বিদ্যালয়বিহীন ১৫শ’ গ্রামে একটি করে নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছে সরকার। জাতীয়করণসহ দেশে প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু জাতীয়করণ হওয়া এসব বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদারকির জন্য পৃথক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
দায়সারা নির্দেশনা ও পরিপত্র:
গত ১৫ জানুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ও সচিব আকরাম-আল-হোসেন সচিবালয়ে ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকা জেলার প্রাইমারি শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কিছু নির্দেশনা দেন। এ সময় সচিব প্রাথমিক শিক্ষকদের সকাল ৯টার মধ্যে অবশ্যই স্কুলে যাওয়া এবং প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শিক্ষার ওপর জোর দেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের অনেক সমস্যা আছে স্বীকার করে গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার মান ভালো না বলে শিক্ষার্থীরা কেজি স্কুলে যাচ্ছে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তা আপনাদের ভালো ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে।’ জাকির হোসেন বলেন, ‘আপনাদের বদলি নিয়ে টিও অফিসে ঝামেলা হয়। অনেক দালাল আপনাদের পেছনে লাগানো আছে। কোন শিক্ষা কর্মকর্তা যদি শিক্ষকদের হয়রানি করেন, আমি তাদের মার্সি করবো না। কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আপনাদের মাথা তারা যেন নষ্ট করতে না পারে। আমি দেখছি এক শিক্ষককে এখানে বদলি করে, ওখানে বদলি করে। এর ভেতর দিয়ে টাকা-পয়সাও নেয়া হয়।’ গত ১৫ অক্টোবর পাঠদান পদ্ধতি পরিবর্তনের নির্দেশনা দিয়ে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯টি নির্দেশনা জারি করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হাসান। যদিও এসব নির্দেশনা বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই তা প্রতিফলন ঘটছে না এবং শিক্ষা কর্মকর্তারা এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সচিবের ৯টি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভাষাজ্ঞান বাড়াতে নিয়মিত পাঠ্যাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি। তাই প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি বই থেকে একটি পৃষ্ঠা পঠনের জন্য বাড়ির কাজ দিতে হবে। এক পৃষ্ঠা হাতের লেখা বাড়ি থেকে লিখে আনতে বাড়ির কাজ দিতে হবে। ক্লাসে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট শ্রেণী শিক্ষক সব শিক্ষার্থীকে আবশ্যিকভাবে পঠন করাবেন। শিক্ষকরা নিজেরা শিশুদের সঙ্গে উচ্চারণ করে পাঠ করবেন, এতে শিক্ষার্থীদের উচ্চারণ জড়তা দূর হবে এবং প্রমিত উচ্চারণ শৈলী সৃষ্টি হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্চারণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মনোবল বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। বুক কর্ণার ও এসআরএমের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি শব্দ পড়া, বলা ও লেখা শেখাতে হবে, এর ফলে শিক্ষার্থীদের ভাষার ভান্ডার বাড়বে এবং এতে শিশুর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারবে।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দায়সারা নির্দেশনা দিলে তো হবে না। এগুলো বাস্তবায়নের উপকরণ পাব কোথায়? আমাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, পিয়ন নেই, অবকাঠামো নেই। তাছাড়া যেসব নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে সেগুলো কী আমরা আগে পালন করিনি? যিনি নির্দেশনা জারি করেছেন, তিনি তো দীর্ঘদিন ধরে একই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন।’ সচিবের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করবেন এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ইন্সট্রাক্টর, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, বিভাগীয় উপপরিচালকরা তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে শিক্ষকদের বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে শিশুদের পাঠ্যাভ্যাস সংক্রান্ত এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কী-না তা নজরদারি করবেন।
দু’জন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাফতরিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে গেলে তাদের প্রটোকল দিতে হয়। তাদের নানা রকম ফরমায়েশ প্রতিপালন করতে হয় এবং নিয়মিত সরকারি অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কাজও করতে হয়। এসব দায়িত্বপালন করে মাঠ পর্যায়ে স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার সুযোগই হয় না।’ ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন,‘কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়েই দফতরি নেই, উপজেলা প্রাথমিক অফিসেও বেশির ভাগ পদ শূন্য। ফলে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের পিয়নের কাজও করতে হয়। এসব সমস্যার কথা শুনতেই চান না দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। কিন্তু তাদের নির্দেশনা প্রতিপালনে ন্যূনতম বিলম্ব হলেই শাস্তির মুখে পরতে হয়।’
কমেন্ট বক্স