বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ : জীবননগরে যুবলীগের একাংশের সমাবেশ আজ
উপজেলা যুবলীগের দু’গ্রপের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ : সভাস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করার সম্ভাবনা
জীবননগর/দামুড়হুদা অফিস: জীবননগর উপজেলা যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় যুবলীগের বিবাদমান দুটি গ্রুপ। আজ মঙ্গলবার ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সম্মেলন প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে গতকাল সোমবার বিকালে শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে যুবলীগের একটি অংশ। সমাবেশ থেকে আজকের সম্মেলনকে বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবিসহ প্রতিহতের ঘোষণা দেয়া হয়। যেকোন মূল্যে সম্মেলন প্রতিহত করতে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় জীবননগর বাসস্ট্যান্ডে পাল্টা সমাবেশের ডাক দিয়েছেন নেতৃবৃন্দরা। এ ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আতঙ্কে রয়েছে উপজেলাবাসী। দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ নিয়ে ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশও বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানিয়েছে জীবননগর থানার ওসি। এদিকে, একদিন পর আগামী ৩১ জানুয়ারী দামুড়হুদা উপজেলা যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই সম্মেলনও বাতিলের দাবীতে গতকাল সোমবার বিকেলে যুবলীগের একাংশের আহবায়ক অ্যাড. আবু তালেবের নেতৃত্বে দামুড়হুদা বাসষ্ট্যান্ড থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সম্মেলন বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলটি দামুড়হুদা সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণশেষে বাসস্ট্যান্ডে প্রতিবাদ সমাবেশ করে।
জানা যায়, জীবননগর উপজেলা আওয়ামী লীগের মত স্থানীয় যুবলীগও দু’ভাগে বিভক্ত। একটির নেতৃত্ব দেন উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম ঈসা ও অপরটির নেতৃত্বে রয়েছেন অপরাংশের আহ্বায়ক শামীম ফেরদৌস। এরইমাঝে দীর্ঘ ২৫ বছরের মাথায় অনেকটা ঢাকঢোল পিটিয়ে যুবলীগের সম্মেলনের আহ্বান করেন আহ্বায়ক আব্দুস সালাম ঈসা। উপজেলার শাপলাকলি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, যুবলীগের সম্মেলন বিতর্কিত দাবি করে এর প্রতিবাদে গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টায় উপজেলা হাইস্কুল মাঠ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে যুবলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা। যুবলীগ নেতা শামীম ফেরদৌস ও কাজী সামসুর রহমান চঞ্চলের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলটি উপজেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শহরের চৌরাস্তার মোড় বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আরোফিন আলম রঞ্জু, সাবেক সভাপতি আব্দুল কাদের, যুবলীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম আসমান, রাসেদিন জামান বাকি, জাহাঙ্গীর, টুটুল, জীবননগর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক শামীম ফেরদৌস। থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক নাসির উদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা শাহিনুর রহমান, সোহরাব বিশ্বাস, জাকির হোসেন বিশ্বাস, যুবলীগ নেতা এ্যাড. আকিমুল ইসলাম, চঞ্চল প্রমুখ। এ সময় যুবলীগের ওই বিতর্কিত সম্মেলন প্রতিহত করতে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় জীবননগর বাসস্ট্যান্ডে পাল্টা সমাবেশের ডাক দেয়া হয়। যেকোন মূল্যে ওই সম্মেলন প্রতিহত করা হবে বলেও ঘোষণা দেয় আন্দোলনকারীরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মিদের নিয়ে দলের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি অংশ সম্মেলন করতে চাই। যা দলের চেতনার পরিপন্থী। জেলা যুবলীগের কমিটি গঠন না হয়েই কিভাবে তারা উপজেলা যুবলীগের কমিটি গঠন করছে, তাছাড়া যাদের নিয়ে তারা কমিটি গঠন করতে চলেছে তারা সবাই জামায়াত-বিএনপির লোক। প্রকৃত যারা দীর্ঘ দিন যুবলীগের সাথে জড়িত তাদেরকে বাদ দিয়ে নিজেদের মন গড়া একটি পকেট কমিটি গঠন করছে, তাই যেকোন মূল্যে এই সম্মেলন প্রতিহত করা হবে।
অপরদিকে, উপজেলা যুবলীগ অপরাংশের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম ঈসা বলেন- দীর্ঘ ২৫ বছরের মাথায় যুবলীগের সম্মেলনের আহ্বান করা হয়েছে। আমি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি-সম্পাদকের অনুমতি সাপেক্ষে জীবননগর উপজেলা যুবলীগের কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি। ত্রিবার্ষিক এ সম্মেলনে উদ্বোধক হিসাবে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হক আসাদ। প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজী আলী আজগার টগর, চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ শামসুল আবেদীন খোকনসহ স্থানীয় নেতাকর্মি।

আব্দুস সালাম ঈসা আরও বলেন- যারা যুবলীগের কমিটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, আমি মনে করি তারা সম্পূর্ণ দলীয় নিয়ম শৃংখলা ভঙ্গ করছে। যুবলীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন নিয়ে যদি কারা কোন সমস্যা মনে করত, তাহলে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি-সম্পাদককে বিষয়টি জানাতে পারত। তা না করে তারা অযথা সাধারন মানুষের মধ্যে একটি অশান্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তারপরও আমাদের কার্যক্রম শান্ত সুষ্ঠুভাবে শেষ হবে বলে আমি আশাবাদী।
এদিকে, আগামী ৩১ জানুয়ারী দামুড়হুদা উপজেলা যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সম্মেলন বন্ধের দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে দামুড়হুদা বাসষ্ট্যান্ড থেকে সম্মেলন বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে দামুড়হুদা বাসষ্ট্যান্ডে যুবলীগের একাংশের আহবায়ক অ্যাড. আবু তালেবের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য দামুড়হুদা সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম। প্রধান বক্তা ছিলেন জেলা যুবলীগের অন্যতম নেতা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুর রশিদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও যুবলীগ নেতা রেজাউল হক, আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আফজালুর রহমান বুলু, ইয়াছনবী, আব্দুল হামিদ, উপজেলা যুবলীগ নেতা মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, হযরত আলী, জাহিদুল মেম্বার, জামাত আলী, সাজেদুল ইসলাম মিঠু, হাসান আল বাখার ডলার, শাহিন, রাজু, লাল্টু, রুস্তম, হাফিজ, ছাত্রলীগের রবীন, পাপন, জাহাঙ্গীর মনিরুলসহ প্রমূখ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, যারা প্রকৃত যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ত্যাগী পোড় খাওয়া নেতা তাদেরকে বাদ দিয়ে একটি স্বার্থান্বেশী মহল যুবলীগের নামধারী কতিপয় ব্যক্তিকে নিয়ে আগামী ৩১ জানুয়ারী উপজেলা যুবলীগের সম্মেলন করতে যাচ্ছেন। আমরা তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা এই নোংড়া খেলা বন্ধ করুন। দামুড়হুদা উপজেলা যুবলীগের সম্মেলন ও কমিটি গঠন করা হবে যুবলীগের প্রকৃত নেতাকর্মীদের নিয়ে। এই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে সম্মেলন আয়োজনকারীদের অনুরোধ করছি এই নোংড়া খেলা বন্ধ করুন। তা না হলে যুবলীগ জানে সম্মেলন কি ভাবে বন্ধ করতে হয়।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের এমপির উদ্দেশ্যে বক্তারা বলেন, দলের প্রকৃত নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে আপনার অনুসারি কয়েকজনকে নিয়ে যুবলীগের সম্মেলন করার যে চিন্তাভাবনা করছেন তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আর এটাই হবে আপনার নেতৃত্বের পরিচয়। অন্যথায় আপনি ভুল করবেন। পরিশেষে বক্তারা পুলিশ প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সম্প্রতি দামুড়হুদা বাসষ্ট্যান্ডে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে গেছে। মুখোশধারী অজ্ঞাত যুবকরা মাসুদ রানা ভুট্টুর উপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। কিন্তু ওই ঘটনায় মামলা না দিয়ে কেন উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক অ্যাড. আবু তালেব, সদর ইউনিয়ন আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম ও যুবলীগ নেতা জাহিদুলসহ ১২ জন নেতাকর্মীর নামে চাঁদাবাজী মামলা হলো?
চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আরেফিন আলম রঞ্জু প্রশ্ন তুলে বলেন- দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকে আর কোন কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়নি। যেখানে যুবলীগের জেলা কমিটিই নেই সেখানে উপজেলা যুবলীগের সম্মেলন কিভাবে হয়? এটা আসলেই আমার বোধগম্য নয়। সাংগঠনিক রীতিনীতিতে এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। এ সম্মেলন বাতিল করে সর্বাগ্রে জেলা কমিটি গঠনপূর্বক ঘোষণার দাবি জানান তিনি।
এ ব্যাপারে জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুর রহমান জানান, যেহেতু দুটি গ্রুপই ক্ষমতাসীন দলের এবং দুই গ্রুপই একই দিনে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সে হিসাবে একটি বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। এখনও পর্যন্ত কোন নির্দেশনা আসেনি; আমাদের নির্দেশনা এলেই পরবর্তী আমরা ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম রেজা জানান, মঙ্গলবারে জীবননগর যুবলীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনকে কেন্দ্র দুই গ্রুপের সদস্যরা যে সমাবেশের ডাক দিয়েছে এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলেছি। মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
এদিকে দীর্ঘদিন পর জীবননগর উপজেলা যুবলীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাতে গোটা উপজেলাবাসী চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করছে। যে কোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে।