‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে চুয়াডাঙ্গায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, জনসচেতনতামূলক মহড়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি কমানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পরিবার ও ব্যক্তিপর্যায় থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের কোর্ট মোড় প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। এতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম. তারিক-উজ-জামান, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্রসহ জেলা বিএনপি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।
র্যালি শেষে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং রেড ক্রিসেন্টের যৌথ উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। পরে জেলা পরিষদের সম্মেলনকক্ষে আলোচনা সভা হয়। পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াতের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আশিস মমতাজ। তাঁর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম. তারিক-উজ-জামান।
বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বেড়ে যায়। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনসহ পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে। পৃথিবীকে সবুজ, সুন্দর ও সুরক্ষিত রাখতে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ার উদ্যোগ শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকেই। পাশাপাশি যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
ফায়ার সার্ভিসের জরুরি সেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই ফায়ার সার্ভিসের হটলাইন নম্বর জানেন না। তাই বিভিন্ন জনসমাগমস্থল, হাটবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জরুরি নম্বর প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের মহড়া আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি সেগুলোর ভিডিও ধারণ করে তথ্য ও প্রচারবাহী গাড়ির মাধ্যমে বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে প্রচার করা যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও সচেতনতা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, চুয়াডাঙ্গার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। তবে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সবার প্রাথমিক ধারণা থাকা জরুরি। বাড়ির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা করা, গ্যাস সিলিন্ডারের রেগুলেটর ঠিক আছে কি না নিশ্চিত হওয়া এবং বাসাবাড়ি ও বড় প্রতিষ্ঠানে জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। দুর্যোগের সময়ের পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কমাতেও আগাম প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র এবং চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার ওহিদুল ইসলামসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বক্তারা নিরাপদ পানির ব্যবহার, আর্সেনিক বিষয়ে সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সহায়তায় পানির বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি ভূমিকম্প বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগের সময় বিকল্প সড়ক ব্যবহারের প্রস্তুতি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রেড ক্রিসেন্ট ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন, চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফরহাদুর রেজা, জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক দীপক কুমার সাহা, চুয়াডাঙ্গা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) অধ্যক্ষ মুছাব্বেরুজ্জামান, স্কাউট সদস্য এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এদিকে, ‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মেহেরপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা এবং অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজন করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়ের নেতৃত্বে র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় একই স্থানে এসে শেষ হয়।
র্যালি শেষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এক জাঁকজমকপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতিকুল ইসলাম, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বাবলু সূত্রধর।
আলোচনা সভায় দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা ও পারিবারিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তব্য দেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. ইনজামামুল হক, সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাইদুর রহমান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর রতন শর্মা এবং রেড ক্রিসেন্টের প্রতিনিধি সাব্বির হোসেন।
বক্তারা বলেন, ‘যেকোনো প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। নিজস্ব ঘর থেকেই দুর্যোগ সহনশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারলে পুরো দেশ দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে পারবে।’
আলোচনা সভা শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্যোগে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার তৎপরতা সংক্রান্ত এক বাস্তবভিত্তিক মহড়া প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অপর দিকে, ‘দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ স্লোগানে ঝিনাইদহে দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্প বিষয়ক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে শহরের উজির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে এ মহড়ার আয়োজন করা হয়। এতে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় করণীয়, উদ্ধার কার্যক্রম এবং হতাহত ব্যক্তিদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কৌশল প্রদর্শন করা হয়।
মহড়ার মাধ্যমে দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কী করণীয়, সে বিষয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের সচেতন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী সেলিম রেজা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোসফেকুর রহমান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিপা রানী সরকার, ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি আসিফ ইকবাল মাখনসহ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক