চুয়াডাঙ্গায় গত এক সপ্তাহে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। ডিসেম্বরের শুরুতেই জেলার তাপমাত্রা নেমে গেছে ১৫ ডিগ্রির নিচে। এরই মাঝে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর চাপ। শীতজনিত রোগ নিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা প্রত্যাশীদের ভিড়। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস বলছে, তাপমাত্রা ১০-১২ ডিগ্রির মধ্যে থাকলে চলতি ডিসেম্বরে দ্বিতীয় সপ্তাহে শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। আর সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শীত যদি বাড়ে, রোগীর চাপ আরও বাড়বে।
সদর হাসপাতালের নথি অনুসারে, গত এক সপ্তাহে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছে ১৪৫০ জন রোগী। বহির্বিভাগে গড়ে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসছেন। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি। এর পাশাপাশি শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে চলেছে। গত ৭ দিনে শিশু ওয়ার্ড ২২টি বেডের তুলনায় শিশুরোগী ভর্তি হয়েছে- ১ ডিসেম্বর ৫১ জন, ২ ডিসেম্বর ৫০ জন, ৩ ডিসেম্বর ৭১ জন, ৪ ডিসেম্বর ৫১ জন, ৫ ডিসেম্বর ৭১ জন, ৬ ডিসেম্বর ৭০ জন ও ৭ ডিসেম্বর ৫৯ জন। এক সপ্তাহে শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে ৪২৩ জন। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ৬টি রোগী ধারণক্ষমতার জায়গার তুলনায় চলতি মাসের ১ ডিসেম্বর ৬২ জন, ২ ডিসেম্বর ৭৫ জন, ৩ ডিসেম্বর ৭৯ জন, ৪ ডিসেম্বর ৭৯ জন, ৫ ডিসেম্বর ৮৮ জন, ৬ ডিসেম্বর ৯১ জন ও ৭ ডিসেম্বর ৮৯ জন। এক সপ্তাহে ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন ৫৬৩ জন।
মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে ১১টি বেডের বিপরীতে চলতি মাসের ১ ডিসেম্বর ৬৭ জন, ২ ডিসেম্বর ৬৩ জন, ৩ ডিসেম্বর ৬৪ জন, ৪ ডিসেম্বর ৯০ জন, ৫ ডিসেম্বর ৭৬ জন, ৬ ডিসেম্বর ৫৪ জন ও ৭ ডিসেম্বর ৬১ জন। এক সপ্তাহে ভর্তি হয়েছেন ৪৭৫ জন। পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ২২টি বেডের বিপরীতে চলতি মাসের ১ ডিসেম্বর ৭৭ জন, ২ ডিসেম্বর ৬১ জন, ৩ ডিসেম্বর ৭৬ জন, ৪ ডিসেম্বর ৬০ জন, ৫ ডিসেম্বর ৭৭ জন, ৬ ডিসেম্বর ৫৫ জন, ৭ ডিসেম্বর ৬০ জন। এক সপ্তাহে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৪৬৬ জন।
গতকাল সোমবার হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দেখা যায়, শয্যা সংখ্যার বিপরীতে দুই-তিন গুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। জায়গার সংকট থাকলেও নার্স ও সেবিকারা চিকিৎসাসেবা অব্যহত রেখেছেন। তবে রোগীর স্বজনদের অনেকেই অতিরিক্ত ভিড় এবং চিকিৎসা সেবায় কিছুটা ধীরগতির অভিযোগ করেছেন। নার্সরা বলছেন, রোগীর চাপ বাড়ছে, কিন্তু জনবল সংকটের কারণে অতিরিক্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার তিতুদহ ইউনিয়নের ৬২ নম্বর আড়িয়া গ্রামের সাব্বির হাসান তার দুই মাস বয়সী পুত্র শিশুর চিকিৎসার জন্য ভর্তি করিয়েছেন শিশু ওয়ার্ডে। তিনি সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট হলেও হাসপাতালে ভর্তি থেকে সেবার পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এখানে নোংরা আর দুর্গন্ধ তবে নার্সরা সার্বক্ষণিক আমার বাচ্চাকে দেখভাল করছে।’
হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ৫ বছর বয়সী শিশু ইসরাত তাবাচ্ছুমের মা আরোবী খাতুন বলেন, ‘আমার মেয়ে তিন দিন ধরে এখানে ভর্তি রয়েছে। আগের থেকে এখন সুস্থ আছে। তবে ডাক্তার বলেছে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।’ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স জলি খাতুন বলেন, ২০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ৫০-৬০ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। শীতের কারণে নিউমোনিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের ভর্তি হতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের কাজের চাপ অনেক বেড়েছে।
ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স রহিমা খাতুন বলেন, গত ১০ দিনে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে। এই ওয়ার্ডে পাঁচজন রোগীকে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও গড়ে ৬০-৮০ জন রোগী ভর্তি থাকছে। আক্রান্তদের ৯০ ভাগই শিশু। হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে না পারলে নিউমোনিয়া, সর্দি-কাঁশি বা রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং অনিরাপদ খাবারও ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শীতজনিত রোগ থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে উষ্ণ পোশাক পরানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, নিরাপদ খাবার দেওয়া এবং ঠান্ডা বাতাস থেকে দূরে রাখা জরুরি। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে সঠিক স্যালাইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, নিউমোনিয়া হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আরএমও ওয়াহিদ মাহমুদ রবিন বলেন, শীতকে কেন্দ্র করে শীতজনিত রোগীর চাপ বেড়েছে। শিশুরা ডায়রিয়া, রোটা ভাইরাসজনিত রোগ এবং বয়স্করা নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেশিরভাগ রোগীই বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছে। ওয়ার্ডের রোগীর চাপও সপ্তাহখানেক ধরে কিছুটা বেড়ছে আছে।
প্রধান সম্পাদক