পূর্বশক্রতার জের ধরে হেলাল বিশ্বাসকে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা

আপলোড তারিখঃ 2018-04-08 ইং
পূর্বশক্রতার জের ধরে হেলাল বিশ্বাসকে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার যুগিরহুদা কাশের বাছড়া মাঠের একটি ধান ক্ষেতে দিনদুপুরে নৃশংসতা মাদকাসক্তদের পথের কাঁটা নাকি পারিবারিক পূর্বশক্রতা : হত্যাকারী মানিক বিশ্বাস পলাতক ঘটনাস্থল থেকে ফিরে এসএম শাফায়েত: হত্যা নিয়ে রহস্য; এ কথা নতুন নয়। পূর্ব পরিকল্পিত নাকি আকস্মিক; কেনই বা হত্যা করা হলো বিএনপি নেতা ও বীমা কর্মচারী হেলালুল ইসলাম হেলাল বিশ্বাসকে (৫৫)। আধো আধো মন্তব্য ছাড়া হত্যার মূল কারণ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি কেউ। পরিবারের দাবি মাদক ব্যবসায়ীদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ানোর সন্দেহে তাকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের দাবি পারিবারিক পূর্বশক্রতার জের ধরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবুও মানতে পারছে না তার পরিবার ও স্বজনরা। ঘাতক এখনও ধরা পড়লেও উদ্ধার করা হয়েছে হত্যা কাজে ব্যবহৃত ধারালো দেশীয় অস্ত্রের হাতল। যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় তার মৃত্যু ধারালো অস্ত্রের কোপে হয়েছে। শনিবার দিনদুপুরে ধানক্ষেতে সেচ দেয়ার সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কুপিয়ে খুন করা হয়। এলাকার কয়েকজন চিহ্নিত মাদকসেবী পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে বলে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা জানায়। এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। চম্পা খাতুন নামের এক নারীকে নিয়ে ঘাতক ও নিহতের পারিবারিক দ্বন্ধ দীর্ঘদিনের। নিহত হেলালুল ইসলাম ওরফে হেলাল বিশ্বাস চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার খাদিমপুর ইউনিয়নের জুগিরহুদা গ্রামের মৃত একদিল বিশ্বাসের ছেলে ও খাদিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি। পেশায় সে রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির কর্মচারী। `` নিহতের চাচাতো ভাই আনিছুর রহমান বিশ্বাস জানান, সপ্তাহ তিনেক আগে একই গ্রামের হাসিবুল ইসলামের ছেলে মানিকসহ দুই মাদকসেবী ইয়াবা ও গাঁজাসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তারা জামিন পাওয়ার পর হেলালকে বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিল। ওই মাদকব্যসেবীদের ধারণা বা সন্দেহ হেলালই পুলিশকে খবর দিয়ে তাদেরকে ধরিয়ে দিয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৮টার দিকে গ্রাম থেকে আধা কিলোমিটার দূরে কাশের বাছড়া নামক মাঠে ধানের ক্ষেতে সেচ দিতে যায় হেলাল বিশ্বাস। ওৎ পেতে থাকা অবস্থায় কয়েকজন এসে তাকে উপর্যুপরি কুপিয়ে পালিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হেলালের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা ও ছেলে সৌরভ (১৭)সহ স্থানীয় কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শামীম কবির তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। তিনি জানান, নিহতের দু’পায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপানো হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও তার পায়ের তালুতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর মূল কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। নিহত হেলালের স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা জানান, গ্রামের হাসিবুল ইসলামের ছেলে মানিকসহ গ্রামের কয়েকজন বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিল হেলালকে। এরই একপর্যায়ে শনিবার সকালে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে মানিকসহ তার লোকজন। হত্যার পর তাকে ধান ক্ষেতের মধ্যে ফেলে রেখে যায়। রাজিয়া সুলাতানা আরো জানান, মৃত্যুর আগে শেষ বার তার স্বামী মানিকের নাম উচ্চারণ করেছে এবং বলেছে সেই তাকে কুপিয়ে ফেলে রেখে গেছে। মানিকের সাথে তার পিতা হাসিবুল, মজিবুল ও মন্টুসহ আরো বেশ কয়েকজন ছিল। আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জিহাদ খান ফখরুল আলম বলেন, ‘মাদকসক্তদের সাথে বিরোধ হত্যার প্রধান কারণ নয়। হেলাল বিশ্বাসের সাথে মানিক বিশ্বাসের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। হেলাল বিশ্বাস চম্পা খাতুন নামের এক নারী ও তার পরিবারের পাশে দাড়ালে এ নিয়ে গ্রামে দু’টি গ্রুপ সৃষ্টি হয়। যার অপর পক্ষে মানিকের সক্রিয় অবস্থান ছিল। চম্পা এবং তার পরিবারকে নিয়ে গ্রামে বেশ কয়েকবার বিচার সালিশ হয়েছে, থানায় মামলা হয়েছে; এমনকি এ নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে অনেক বার।’ হেলাল বিশ্বাসকে নিয়ে সৃষ্ট এ আলোচনা সমালোচনা টক অব দ্যা ভিলেজে পরিণত হলে দৈনিক সময়ের সমীকরণসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয়- ‘হেলাল বিশ্বাস চম্পা খাতুন নামের ওই নারীর বাড়িতে যাতায়াত করতো এবং তার মেয়ের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি গ্রাম্য পরিবেশে আপত্তিকর হওয়ায় বাধা দিতে গেলে গোলযোগ হয়। এরই এক পর্যায়ে গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে হেলাল বিশ্বাসের অপকর্মের কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে। চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মজিবুল হক মালিক মজু জানান, হেলাল খাদিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি। হেলাল দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক ছিলেন। চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহা. কলিমুল্লাহ জানান, লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদেন্তর পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর দোষিদের গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিকাল সাড়ে ৩টা নাগাদ ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। হেলালের দু’পায়ই কোপের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। পায়ের তালুতেও গভীর ক্ষত দেখা গেছে। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোন স্থানে বড় ধরণের আঘাতে চিহ্ন নেই। তবে লাশ দেখে অনেকে বলছেন পরিকল্পিত ও পেশাদার হত্যাকারী এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত। হত্যা কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ধারালো অস্ত্র। হাসপাতাল থেকে বিকেল ৪টার দিকে হেলালের লাশ তার নিজগ্রাম আলমডাঙ্গার যুগিরহুদা গ্রামে নেয়া হয়। খবর পেয়ে সেখানে আগে থেকেই তার পরিবারের লোকজন, নিকটাত্মীয় ও শুভাকাঙ্খীরা ভিড় জমান। গাড়ী থেকে লাশ নামানো হলে কান্নার রোল পড়ে গোটা এলাকাজুড়ে। কেউ বলছেন অনেক পরোপকারী ছিলেন হেলাল বিশ্বাস। আবার কেউ বলছেন পুলিশের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার সুবাদে মানুষকে অনেক হয়রানি করিয়েছে হেলাল। তবে কথার শোরগল তেমন একটা না শোনা গেলেও হাজার হাজার মানুষ ও গ্রামবাসীকে চোখের পানি ফেলতে দেখে যায়। কেউই এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। সবার দাবি হত্যাকারীদেরকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেয়া হোক এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। একই সাথে হেলালুল ইসলামের হত্যার আসল রহস্য উন্মোচন করা হোক দ্রুত। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর ও আলমডাঙ্গা সার্কেল)। এ সময় তিনি যুগিরহুদা কাশের বাছড়া মাঠের যে স্থানে হেলালুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই এলাকার চারপাশ ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলেন। পরে নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন এবং সান্তনা দেন। হেলালের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানার সাথে এ সময় বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন পুলিশ সুপার। তার মুখ থেকে হত্যার আসল রহস্য ও কী হয়েছিল আজ (হত্যা সংঘটিতর দিন) জানতে চান। পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। একটি হত্যাকান্ড হয়েছে; এখন পুলিশ হত্যাকারীকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। দ্রুতই দোষী/ দোষীদেরকে ধরে আইনের আওতায় নেয়া হবে। হত্যার রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা অব্যহত রয়েছে।’ গতকাল শনিবার বাদ মাগরিব যুগিরহুদা গ্রামের ঈদগাহ মাঠে নিহত হেলালুল ইসলামের নামাজে জানাযা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়েছে। তার জানাযায় দলমত নির্বিশেষে হাজারো মানুষের ঢল নামে। হেলালুল ইসলাম হেলাল বিশ্বাসের পরিচয়: হেলাল বিশ্বাস আলমডাঙ্গা উপজেলার যুগিরহুদা গ্রামের মৃত একদেল বিশ্বাসের ছেলে। সে একদেল বিশ্বাসের পাঁচ ছেলের মধ্যে ছোট। সাংসারিক জীবনে ১ম বিবাহ করেন রুশি খাতুনের সাথে। তার সংসারে রয়েছে দুই মেয়ে শুকলা (২৫) ও রিয়া (১৭)সহ এক ছেলে সৌরভ (১৮)। বড় মেয়ে শুকলার বিয়ে হয়েছে পুলিশ পরিদর্শক আকিকুল ইসলামের সাথে। ছোট মেয়ে রিয়া বয়স্ক প্রতিবন্ধী; তাই তার পড়াশোনা করা হয়নি। একমাত্র ছেলে সৌরভ চুয়াডাঙ্গা ভি.জে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র; এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ১ম স্ত্রী ও সন্তান থাকা সত্বেও ওই স্ত্রীর অনুমতিক্রমেই স্কুল শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা পপির সাথে ২য় বিবাহ করে হেলাল বিশ্বাস। দুই স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বেশ সুখের সংসার ছিল তার। সামাজিক ভাবে বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িত থাকাসহ তার রয়েছে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচিতি। এক সময়ের তুখোড় ছাত্রদল নেতা ছিলেন হেলাল বিশ্বাস। বর্তমানে খাদিমপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সে পূর্বের কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। পেশায় বেসরকারি লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি রূপালী ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকুরীরত ছিলেন।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)