ছবির ক্যাপশন:
চিরাচরিত চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষ নয়; বরং ফসলের সবুজ মাঠকেই পাঠশালা বানিয়ে চলছে নতুন দিনের কৃষি শিক্ষা। হাতে বই-খাতা আর চোখেমুখে নতুন কিছু শেখার দুর্নিবার আগ্রহ নিয়ে সেখানে অংশ নিচ্ছেন এলাকার প্রান্তিক কৃষক-কৃষাণীরা। কেউ সেখানে হাতে-কলমে শিখছেন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের কৌশল, কেউ বা আবার গড়ে তুলছেন সুজলা-সুফলা পুষ্টিবাগান। কম খরচে অধিক ফলন ফলানোর আধুনিক সব কলাকৌশল নিয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পাগলাকানাই ইউনিয়নের বানিয়াকান্দর গ্রামে এমন এক ব্যতিক্রমী ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল’ কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়।
অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কৃষিকে আরও পরিবেশবান্ধব, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও লাভজনক করে তোলার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা, পাগলাকানাই ইউনিয়নের বানিয়াকান্দর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহানারা খাতুন, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন বয়সের উৎসাহী প্রান্তিক কৃষক-কৃষাণীরা শুক্রবার দিনভর অংশগ্রহণ করেন।
মাঠের এই স্কুলে কেবল গতানুগতিক ফসল ফলানোই নয়; বরং পুষ্টির উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, পরিবেশবান্ধব উপায়ে চাষাবাদ এবং কৃষিকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করার নানা কৌশলও শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে চাষাবাদের পাশাপাশি নিজ পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মিটিয়ে অনেকেই এখন বাড়তি আয়ের সোনালী পথ খুঁজে পাচ্ছেন। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এলাকার অনেক কৃষাণী বাড়ির পাশের খালি জমিতেই গড়ে তুলেছেন নজরকাড়া সবজির বাগান।
বানিয়াকান্দর গ্রামের কৃষাণী বিথী খাতুন জানান, ‘আগে তো আমরা শুধু নিজেদের পুরনো ধারণা আর খেয়ালখুশি অনুযায়ী চাষবাদ করতাম। কিন্তু এই প্রশিক্ষণে আসার পর সার, বীজ ও ফসলের সঠিক পরিচর্যা নিয়ে একেবারে নতুন অনেক কিছু জানতে পেরেছি। এখন সঠিক নিয়মে চাষ করায় কম খরচে অনেক ভালো ফলন পাওয়ার আশা তৈরি হয়েছে।’
কৃষক রিপন হোসেন বলেন, ‘এই স্কুল থেকে পুষ্টি ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সবজি চাষের ওপর অনেক কিছু শিখেছি। সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এখন নানা জাতের শাকসবজি চাষ করছি, যার ফলে অল্প খরচে অধিক ফলন ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে।’ শিক্ষার্থী নিশিতা বিশ্বাস বলেন, ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুলের মাধ্যমে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ, ক্ষতিকর রোগবালাই দমন এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার কৌশলগুলো শিখছি। এতে কৃষকদের অযথা বাড়তি খরচ কমার পাশাপাশি শতভাগ নিরাপদ ফসল উৎপাদনে দারুণ উৎসাহ মিলছে।’
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘আমাদের প্রান্তিক কৃষক-কৃষাণীদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, পুষ্টির উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই পার্টনার ফিল্ড স্কুলের এই আয়োজন। কৃষকরা যেন তাদের বহুদিনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সর্বনিম্ন খরচে সর্বোচ্চ ফলন পেতে পারেন, সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। কারণ উর্বর মাটি কিংবা উন্নত বীজ একা ভালো ফলন দিতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান ও দক্ষতা। মাঠের এই উন্মুক্ত পাঠশালা সেই ঘাটতি পূরণ করে কৃষিতে এক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে।’
