ছবির ক্যাপশন:
শিক্ষার্থীদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা, অথচ তাদের একটি অংশের হাতে দেখা যাচ্ছে সিগারেট। বিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে কিংবা সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিড়ি-সিগারেটের দোকান। কোথাও চায়ের দোকানের আড়ালে, কোথাও আবার ছোট ও অন্ধকার কক্ষে বেঞ্চ পেতে চলছে ধূমপানের আসর। শুধু বিক্রিই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলাকালীন সময়েও এসব দোকানে বসে চা-সিগারেট পান করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। অনেক ক্ষেত্রে দোকান থেকেই সিগারেট কিনে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদেরও।
চুয়াডাঙ্গা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। জেলার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিক্টোরিয়া জুবিলি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (ভি জে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়), চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা একাডেমি, রেলবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের আশপাশে প্রকাশ্যে বিড়ি-সিগারেট বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়েছে। কোথাও শিক্ষার্থীদের দোকানে বসে, কোথাও আবার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট পান করতে দেখা গেছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও সচেতন মহলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভিক্টোরিয়া জুবিলি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ফটকের ঠিক বিপরীত পাশে একটি দোকানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে বিড়ি-সিগারেট। দোকানটিতে শিক্ষার্থীদের কাছে সিগারেট বিক্রি নিষেধ- এমন লেখাও রয়েছে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই চলছে বিক্রি। বিদ্যালয়ের আশপাশে আরও দুই-তিনটি দোকানে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি হতে দেখা গেছে। এসব দোকানে বিদ্যালয় চলাকালীন সময়েও বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভিড় থাকে। শিক্ষার্থীদেরও সেখানে যাতায়াত করতে দেখা যায়।
ওই বিদ্যালয়ের সামনে সিগারেট বিক্রি করা দোকানি শুকুর আলী বলেন, ‘আমার বিড়ি-সিগারেটের দোকান, আমি তো বেচবই। ম্যাজিস্ট্রেট সেদিন এসে ৩০০ টাকা জরিমানা করে গিয়েছে। তারপরও আমি সিগারেট বিক্রি করছি। সিগারেট বিক্রি না করলে সংসার চলবে কী করে? আমার চায়ের দোকান, আমাকে তো সিগারেট বেচতেই হবে।’
চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও একই পরিস্থিতি। বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে সিগারেট বিক্রির দোকান। শিক্ষার্থীদের চলাচলের পথের কাছেই এসব দোকানে অবাধে বিক্রি হচ্ছে তামাকজাত দ্রব্য। চুয়াডাঙ্গা একাডেমি ও রেলবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।
শুধু বিদ্যালয় নয়, কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ধূমপানের প্রবণতা দৃশ্যমান। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সামনে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করতে দেখা যায়। এসব দোকানের ক্রেতাদের মধ্যে কলেজের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। কেউ দোকান থেকে সিগারেট কিনে কলেজের বাইরে দাঁড়িয়েই ধূমপান করছে। আবার কেউ দোকানের আশপাশে অবস্থান করছে। দোকানিদেরও প্রকাশ্যেই সিগারেট বিক্রি করতে দেখা গেছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে চুয়াডাঙ্গা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ও আশপাশে। বিদ্যালয়ের সামনে, পাশের সড়কে এবং কিছুটা দূরে একাধিক দোকানে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। দোকানগুলোতে স্থানীয় বিভিন্ন বয়সী মানুষ বসে প্রকাশ্যেই ধূমপান করছেন। ছোট ছোট কক্ষে বেঞ্চ পেতে বসার ব্যবস্থাও রয়েছে। বিদ্যালয়টির পাশেই অবস্থিত চুয়াডাঙ্গা আদর্শ মহিলা কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির আশপাশেও একই পরিস্থিতি। এলাকার কমবয়সী ছেলেদের এসব দোকানে ভিড় করতে দেখা যায়। বিশেষ করে বিদ্যালয় ছুটির সময় দোকানগুলোতে তাদের উপস্থিতি বাড়ে। কেউ সিগারেট কিনছে, কেউ দোকানে বসে ধূমপান করছে। ফলে বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাচলের পরিবেশেও এর প্রভাব পড়ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাকজাত দ্রব্যের এমন অবাধ বিক্রির বিরুদ্ধে দেশে সুস্পষ্ট আইন রয়েছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫-এর সর্বশেষ সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশুপার্কের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে বিড়ি, সিগারেটসহ কোনো ধরনের তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা যাবে না।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর জারি করা সংশোধনী অধ্যাদেশে যুক্ত হওয়া এ বিধান পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৯১ নং আইন)-এ বহাল রাখা হয়েছে। আইনের ৬খ ধারার উপধারা (১)-এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই ধারার উপধারা (৩) অনুযায়ী, এ বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার বা বারবার একই অপরাধ করলে পর্যায়ক্রমে দ্বিগুণ হারে জরিমানা দিতে হবে। সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান চাইলে সাধারণ বা বিশেষ আদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ এলাকার পরিধি আরও বাড়াতে পারবে।
শুধু তাই নয়, ২০০৫ সালের মূল আইনের ৬ক ধারার উপধারা (১) অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যক্তির কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করাযাবে না। অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে তামাকজাত দ্রব্যের বিপণন বা বিতরণের কাজেও নিয়োগ করা নিষিদ্ধ। এ বিধান অমান্য করলে উপধারা (২) অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হারে জরিমানার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, আইনের ৪ ধারায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ পাবলিক প্লেসে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আইনের সংশোধিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও কফি হাউসের মতো স্থান পাবলিক প্লেসের অন্তর্ভুক্ত। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে কিংবা আইনের আওতাভুক্ত খাবারের দোকানে ধূমপানের সুযোগ নেই।
অর্থাৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে সিগারেট বিক্রি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আইনের আওতাভুক্ত পাবলিক প্লেসে ধূমপান- দুটি পৃথক অপরাধ। একটির জন্য ৬খ ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা এবং অন্যটির জন্য ৪ ধারায় সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আইনের ৯ ধারায় কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পাবলিক প্লেস, গণপরিবহন এবং তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়স্থল ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা হলে তা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে তাঁদের। ফলে শুধু জরিমানা নয়, নিয়মিত পরিদর্শন ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে প্রশাসনের।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, ‘এটি দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে তদারকি কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। তবে শিক্ষকদের বদলিসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমরা দ্রুত তদারকি কমিটি গঠন করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও জনবল ও প্রয়োজনীয় কর্মকর্তার সংকট রয়েছে। জেলা প্রশাসনের সীমিত জনবল দিয়ে সব জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে অনেক সময় অভিযান কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে।’
