ছবির ক্যাপশন:
‘জাগো নব সৃষ্টির মহানন্দে’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাত দিনব্যাপী নজরুল উৎসবের বর্ণাঢ্য সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংগীত, কবিতা, আবৃত্তি, নাটক ও নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর সমাপনী দিনের আয়োজন পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। বিশেষ করে কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘নীলকুঠি’ নাটকের মঞ্চায়ন দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে। শেষ দিনের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে বিভিন্ন বয়সী দর্শক, সংস্কৃতিকর্মী ও সুধীজনের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে জেলা পরিষদের আয়োজনে এ সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করা হয়। পরে প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র। এরপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম, কবিতা, গান ও নাটকের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা করেন প্রধান আলোচক চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও নজরুল গবেষক ড. মুন্সি আবু সাইফ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় চুয়াডাঙ্গার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এ জেলার সাংস্কৃতিক অবস্থান ও অর্জন বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মধ্যে সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও চিত্রাঙ্কন চর্চার মানসিকতা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বিশ্বমানের নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা করেন তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের অমূল্য সম্পদ। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের ভয়াবহতা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। নজরুল চর্চা ও তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান শিল্পী তুলে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, স্কুল, মাদ্রাসা, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত শিল্পী অন্বেষণের কার্যক্রম চলছে। গান, নাচ, নাটক, অভিনয়, কবিতা আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নয়, জেলার সব সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীদের সম্পৃক্ত করতেই সাত দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে এতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরেও সাত দিনব্যাপী যাত্রাপালার আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে চুয়াডাঙ্গাকে আরও এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
জেলা পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার বলেন, অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। সমাজের মাদক, কিশোর গ্যাং ও অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধ দমনে পুলিশ কাজ করছে। সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুমহল সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন বলেন, নজরুলের বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে নজরুল বর্ষের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চুয়াডাঙ্গার হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম ও কালচারাল কমপ্লেক্স নির্মাণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ কামনা করেন তিনি।
এছাড়া বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক শারমিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম. তারিক উজ-জামান, জেলা কালচারাল অফিসার সাইফুল ইসলাম মিলন ও জেলা জাসাসের সভাপতি সেলিমুল হাবিব সেলিম।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কণ্ঠশিল্পী ও জেলা আবৃত্তি পর্ষদের পরিচালক মনোয়ারা খুশি, এবং নুসরাত জাহান করবী। আলোচনা পর্ব শেষে নজরুলের গান ও কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করেন শিল্পীরা। এরপর মঞ্চস্থ হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা নাটক ‘নীলকুঠি’। নাটকটি পরিবেশন করে কার্পাসডাঙ্গা নজরুল স্মৃতি সংঘ। শিল্পীদের প্রাণবন্ত অভিনয়, মঞ্চসজ্জা ও পরিবেশনায় নাটকটি উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। শেষ দিনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও নাটককে ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে পুরো শিল্পকলা একাডেমি চত্বর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
পরে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত পুরস্কার বিতরণ পর্ব। সাত দিনব্যাপী উৎসবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ৭৯ জন প্রতিযোগীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশগ্রহণকারীরা পুরস্কার গ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগীদের প্রত্যেককে ক্রেস্ট ও বই উপহার দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা জেলায় এবারই প্রথম এত বড় পরিসরে সাত দিনব্যাপী নজরুল উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবের সাত দিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা সংগীত, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নেন। প্রতিদিনই দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে উৎসব প্রাঙ্গণ। তৃণমূল পর্যায়ের শিল্পীদের প্রতিভা তুলে ধরা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নজরুলের সাম্য, মানবতা, প্রেম ও বিদ্রোহের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, গুণিজনের আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে জমকালো আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে সাত দিনব্যাপী নজরুল উৎসবের।
