ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গায় দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্যরা। বিশেষ করে জমিজমার বিরোধসহ দেওয়ানি মামলায় আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে লিগ্যাল এইডের আওতাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সেবার পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে তিনটায় চুয়াডাঙ্গা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির মাসিক সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ রফিকুল ইসলাম। সভায় লিগ্যাল এইডের ৩১টি মামলা নিষ্পত্তি এবং নিয়োজিত আইনজীবীদের ৩১টি বিল অনুমোদনের বিষয় জানানো হয়।
সভায় আইনগত সহায়তার আবেদন পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আগের সভার কার্যবিবরণী অনুমোদন, লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শুদ্ধাচার ও নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হয়। মাসিক সভায় পাঁচজন প্যানেল আইনজীবীর মধ্যে চারজন উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মারুফ সারোয়ার বাবু বলেন, গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ দেওয়ানি মামলা ও জমিজমার বিরোধে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে জানেন না। প্রত্যন্ত এলাকার এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা মামলার নোটিশ পেলেও তা পড়তে পারেন না। আবার নোটিশ পড়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও বুঝতে পারেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিপক্ষ একতরফা রায় পেয়ে যায়।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে লিগ্যাল এইডের ধারণা মূলত পারিবারিক বিরোধ, যৌতুক কিংবা প্রতারণার মতো ফৌজদারি মামলাকেন্দ্রিক। অথচ অল্প জমি নিয়ে বিরোধে থাকা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিরাও এ সেবা পেতে পারেন। এ বিষয়ে মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আলাদা প্রচার কার্যক্রম ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। তবে বিচারকসংকটের কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সভায় আইনজীবী আফরোজা আক্তার বলেন, লিগ্যাল এইডের আওতায় একটি মামলা পরিচালনার জন্য সরকারিভাবে ১ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অথচ মামলার পলাতক আসামির হাজিরা নিশ্চিত করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য আদালতের বেঞ্চ সহকারী ২ হাজার ৫০০ টাকা নেন বলে তিনি সভায় উল্লেখ করেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
দামুড়হুদা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শেখ মো. নুরুল্লাহ বলেন, গত মাসে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পাঁচ থেকে সাতজনকে লিগ্যাল এইডের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পারিবারিক বিরোধ নিয়ে থানায় মামলা করতে আসা ব্যক্তিদেরও এ সেবা নেওয়ার কথা বলেছেন। থানায় আসা অভিযোগগুলোর মধ্যে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাই এ ধরনের বিরোধে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে মানুষকে জানানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, এখন থেকে এ বিষয়ে সব থানায় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেবেন, যাতে জমিজমার বিরোধে জড়িত অসচ্ছল মানুষও বিনামূল্যে আইনি সহায়তার সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মীর্জা শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতি সপ্তাহে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পারিবারিক ও জমিজমাসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে অনেক মানুষ আসেন। তাদের বড় একটি অংশ আর্থিকভাবে অসচ্ছল। আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকায় অনেকে সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। এ ধরনের মানুষকে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সেবা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সভাপতির বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত পিছিয়ে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করে আইনগত সহায়তার আওতায় আনতে হবে। লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্যদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের কাছে এ কার্যক্রমের তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। সভায় উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আইন অনুযায়ী বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
চুয়াডাঙ্গা সদর আদালতের সিভিল জজ নাসির হুসাইনের সঞ্চালনায় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতিনিধি মোস্তফা কামাল, সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি ডা. শামীমা ইয়াসমিন, জেলা তথ্য কর্মকর্তার প্রতিনিধি পারভীন সুলতানা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেন, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পিপি মারুফ সারোয়ার বাবু, সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) আব্দুল খালেক, বিশেষ পিপি শাহজাহান মুকুল, সিনিয়র সাংবাদিক অ্যাডভোকেট মানিক আকবরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
