ছবির ক্যাপশন:
আলমডাঙ্গা উপজেলার পাইকপাড়া জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষার (টেস্ট) ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। কোচিং সেন্টারে আগে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়ার দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রধান শিক্ষক বরাবর লিখিত আবেদন করেছে তারা।
পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি পরিচয় দেওয়া রুজন আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন ইউএনও।
গতকাল সোমবার বিদ্যালয়ে ইংরেজি প্রথম পত্রের টেস্ট পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর তারা দেখতে পায়, গত ২৩ অক্টোবর পাইকপাড়া ওয়েলফেয়ার একাডেমি কেয়ারে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল রয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা না দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসে।
পরে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কোচিং সেন্টারের সামনে মানববন্ধন করে। এসময় তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণ এবং কোচিং সেন্টারটি বন্ধের দাবি জানায়। শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, পূজার ছুটির আগে অনুষ্ঠিত গণিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গেও ওই কোচিং সেন্টারে নেওয়া পরীক্ষার প্রশ্নের অনেক মিল ছিল। একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নের এমন মিলের ঘটনায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংরক্ষণ ও গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা।
পাইকপাড়া জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন তৈরি করেছিলেন বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষিকা আক্তার জাহান। তিনি পূজার ছুটির আগেই প্রশ্ন তৈরি করে জমা দেন। পরে অন্য একজন শিক্ষককে দিয়ে প্রশ্নটি কম্পোজ করিয়ে চূড়ান্ত করা হয়। বাইরে থেকে কারও কাছ থেকে প্রশ্ন তৈরি বা সংগ্রহ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘কোচিং সেন্টারের প্রশ্নের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রশ্ন হুবহু কীভাবে মিলে গেছে, তা বুঝতে পারছি না। সকালে পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র দেওয়ার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল থেকে বের হয়ে আসে। তারা আবেদন করেছে, ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে অন্যদিন নেওয়া হোক।’
বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষিকা আক্তার জাহান বলেন, ‘ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন তৈরির দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি পূজার ছুটির আগেই প্রশ্নপত্র তৈরি করে প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দিয়েছি। প্রশ্ন কীভাবে ফাঁস হলো, সে বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমার দায়িত্ব ছিল প্রশ্ন তৈরি করে প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দেওয়া, আমি তা করেছি।’
পাইকপাড়া ওয়েলফেয়ার একাডেমি কেয়ারের পরিচালক নীলচাঁদ হোসেন দাবি করেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্ন তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। অন্য কারও কাছ থেকে প্রশ্ন নেননি বলেও জানান তিনি। প্রশ্ন তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নীলচাঁদ হোসেন বলেন, গুগল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় তিনি প্রশ্ন তৈরি করেছেন। তবে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় সাংবাদিকেরা তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নপত্র ও প্রশ্ন তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি।
প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলের অভিযোগ নিয়ে কোচিং পরিচালকের বক্তব্য নেওয়ার একপর্যায়ে তিনি মুঠোফোনে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁকে নিজের ভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই ব্যক্তি রুজন আলী, যিনি ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি বলে পরিচয় দেন। সাংবাদিকদের অভিযোগ, ফোনে কথা বলার সময় রুজন আলী তাঁদের উদ্দেশে বলেন, ‘এলাকায় ঢুকেছেন কার অনুমতিতে, ওই প্রতিষ্ঠান আমার। আপনাদের এত সাহস হয় কীভাবে আমার প্রতিষ্ঠানে আসার, এরপর থেকে এলাকায় ঢুকলে আমার অনুমতি নিয়ে ঢুকবেন।’
তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এভাবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর পাইকপাড়া জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৭৮ জন শিক্ষার্থী এসএসসি টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন পাইকপাড়া ওয়েলফেয়ার একাডেমি কেয়ারে কোচিং করে।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই এবং এ ঘটনায় কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার বলেন, ‘এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমরা একটি স্মারকলিপি পেয়েছি। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
প্রশ্নপত্রের সঙ্গে কোচিং সেন্টারের প্রশ্নের মিলের অভিযোগের সত্যতা, প্রশ্নপত্র তৈরির পর কীভাবে তা সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং এ ঘটনায় কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
