ছবির ক্যাপশন:
জাপান সরকারের আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে আগামী ২৬ অক্টোবর টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে এ সফরে অংশ নেবেন।
নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সফরে এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৬.৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেবে জাপান। বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ‘বিনিয়োগ হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মূলত অটোমোবাইল, উৎপাদন শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো খাতে এ অর্থ বিনিয়োগ করা হবে। এছাড়া ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে’ সুমিতোমো করপোরেশনসহ প্রধান জাপানি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই সফরে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেবে বাংলাদেশ। এগুলো হলো দুই দেশের মধ্যে বড় বিনিয়োগ, বাণিজ্য, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানো। চলতি সফরে বেশ কয়েকটি নতুন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই সফরে জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো গভীর করা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
টোকিওর চার দিনের সরকারি সফরে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি ও তরুণদের কর্মসংস্থান, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পাবে। সফর ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা, জাপানের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। ২০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা:
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। যাগী। অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন বাংলাদেশকে বানানো হবে ‘বিনিয়োগ হাব’। সফরে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, যৌথ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শ্রমশক্তিকে প্রশিক্ষিত করার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুললে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। েবিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরেও ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনশক্তি, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইপিএ বাস্তবায়নে বাণিজ্য সম্প্রসারণ:
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় পণ্যের শুল্ক হ্রাস বা বিলোপের পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা-বাণিজ্য, ই-কমার্স এবং বাণিজ্য সহজীকরণের বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তির নির্দিষ্ট সুবিধা কার্যকর হবে সংশ্লিষ্ট বিধান ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া অনুযায়ী। প্রধানমন্ত্রীর সফরে ইপিএ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাতপণ্য, ওষুধ, পাটজাতপণ্য ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষ জনশক্তি ও তরুণদের কর্মসংস্থান:
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণও সফরের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে জাপানে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের শিল্প খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আধুনিক উৎপাদনপদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশের উপযোগী দক্ষতা অর্জন জরুরি। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে জাপানি কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী কর্মী তৈরি করা সম্ভব। তবে কর্মী নিয়োগের সুযোগ বা নতুন কোনো কর্মসূচিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট সমঝোতা ও সরকারি ঘোষণা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
জাইকা, জেবিআইসি ও জেট্রোর সঙ্গে আলোচনা:
সফরসূচিতে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বৈঠকে উন্নয়ন অর্থায়ন, নতুন বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামেও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। এ আয়োজন দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত করা এবং বাস্তব বিনিয়োগ প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মেট্রোরেল ও মাতারবাড়ি প্রকল্পে গুরুত্ব:
বাংলাদেশে জাপানের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উদ্যোগগুলোর মধ্যে ঢাকার মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ি উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্পের অগ্রগতি, বাস্তবায়নসংক্রান্ত জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পগুলো সময়মতো সম্পন্ন ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে যোগাযোগব্যবস্থা, পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়, সময়সীমা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল বিবেচনায় রাখা জরুরি। শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, চলমান প্রকল্পের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা:
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, কৃষি এবং পরিবেশ সংরক্ষণেও সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে জাপানের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ কাজে লাগানো যেতে পারে। দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়েও দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার কথা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে জাপানের কূটনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
