ছবির ক্যাপশন:
একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতিই ছিল জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অবস্থান। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই রাজনৈতিক সমীকরণে যুক্ত হয়েছে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর রাজনীতির মাঠে বদলে গেছে বিরোধিতার কেন্দ্রও। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতার চেয়ে বিএনপির কর্মকাণ্ড, বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়েই এখন বেশি সরব জামায়াত ও এনসিপি। ফলে এ দুই দলের কর্মসূচি ও সংস্কার ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপির রাজনৈতিক দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
একদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে বিএনপিও তাদের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দেওয়ার কথা বললেও মাঠে সতর্ক অবস্থান রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসানের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সেখানে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের মধ্যে জনসমর্থন ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা সামনে চলে এসেছে। তবে জামায়াতের কাছে বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে যাওয়া দেশের রাজনীতির জন্য শুভকর নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, ‘বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘমেয়াদে মুখোমুখি অবস্থান বা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে গেলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সুযোগ নিতে পারে। ফলে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।’ তার মতে, একদিকে আওয়ামী লীগের তৎপরতা মোকাবিলা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্যও চ্যালেঞ্জ হবে।
সংস্কার ইস্যুতে প্রকাশ্য বিরোধ:
বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপির বিরোধের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সংস্কার ইস্যু। বিএনপি সংবিধান অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী বাস্তবায়ন চায়। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ অভিযোগ করেছেন- সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে বিএনপি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার ভাষ্য, সংস্কার বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি এবং বিরোধী দলকে উপেক্ষা বন্ধের দাবিতে তারা কর্মসূচি দেবেন। অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জামায়াতের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে ‘হঠকারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার অভিযোগ, জামায়াত শুরু থেকেই ‘ফ্যাসিবাদী কায়দায়’ রাজনীতি করছে এবং জাতীয় ঐক্যের পথে তারা বাধা তৈরি করছে।
রাজপথেও মুখোমুখির আশঙ্কা:
সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও দুই দলের দূরত্ব বাড়ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবিতে গত মাসের সেপ্টেম্বর থেকে বিভাগীয় শহরে লংমার্চ শুরু করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ১০ অক্টোবর খুলনা ও ২৪ অক্টোবর সিলেটের কর্মসূচির পর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় বড় মহাসমাবেশের ঘোষণা রয়েছে। সেখানে সরকারকে দাবিগুলো বাস্তবায়নে সময়সীমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে জোটটির।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, তারা দলীয় দাবির চেয়ে ‘গণদাবি’ নিয়ে রাজপথে রয়েছেন। সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার পাশাপাশি প্রয়োজনে রাজপথে জবাব দেওয়ার কথাও জানান তিনি। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারও বিএনপির সমালোচনা করে বলেছেন, বিরোধী দল বসে থাকবে না। জোটগত কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি নিজস্ব কর্মসূচি নিয়েও মাঠে থাকবে।
আ.লীগ প্রসঙ্গেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ:
বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বের মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন অভিযোগ করেছেন, জামায়াত-এনসিপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা আবার মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বাস-ট্রেনে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের মতো কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন।
অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত বিরোধের আরেকটি প্রকাশ্য উদাহরণ এনসিপির সাম্প্রতিক কর্মসূচি। চাঁদাবাজি ঠেকাতে রাজধানীর বাংলামোটর-হাতিরপুল এলাকায় ‘চাঁদাবাজ পুনর্বাসন দানবাক্স’ নিয়ে প্রতীকী কর্মসূচি পালন করেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। কর্মসূচিতে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে স্লোগান দেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা। হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, বাজার, হাসপাতাল, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির কারণে মানুষ অতিষ্ঠ। প্রতীকী দানবাক্সে অর্থ তুলে চাঁদাবাজদের ‘ভিক্ষা’ দেওয়ার ব্যঙ্গাত্মক কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ব্যবসায়ীদের দোকানে এ ধরনের বাক্স রাখার আহ্বান জানান। তার বক্তব্য, কোনো চাঁদাবাজ দোকানে এলে তাকে ভিক্ষার বাক্স দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
