ছবির ক্যাপশন:
আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের চড়া দামে যখন সেচ খরচ মেটাতে গিয়ে কালঘাম ছুটছে প্রান্তিক চাষীদের, ঠিক তখনই ঝিনাইদহের মাঠে মাঠে আশার আলো ছড়াচ্ছে পরিবেশবান্ধব সৌরশক্তি। সোলার পাম্পের বদৌলতে শুধু নিজেদের ফসলি জমির সেচ খরচই অর্ধেকে নেমে আসেনি, উদ্বৃত্ত পানি প্রতিবেশী চাষীদের কাছে বিক্রি করে বাড়তি উপার্জনের পথও খুঁজে পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার মহেশপুর, কোটচাঁদপুর ও সদর উপজেলায় ইতিমধ্যে ১০৬টি সৌরচালিত সেচ পাম্প চালু হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্তঘেঁষা মহেশপুরেই স্থাপন করা হয়েছে ৩২টি। এইড ফাউন্ডেশনের ৩৪, বিএডিসির ৭টি ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ৬৫টি। এর বাইরেও কিছু ছোট ছোট সোলার আছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও পিকেএসএফ-এর কারিগরি সহায়তায় রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশন (আরআরএফ) ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি ইডকল-এর (ওউঈঙখ)উদ্যোগে ব্যক্তিগত পর্যায়েও বসানো হচ্ছে সোলার প্যানেল।
সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে মহেশপুরের সীমান্ত এলাকার ফুলচাষীদের মাঝে। উপজেলার ফুলচাষী গফুর মিয়া জানান, সোলার পাম্প বসানোর পর থেকে তেল বা বিদ্যুতের আর কোনো ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে না। নিজের জমিতে সেচ দেওয়ার পর সাশ্রয়কৃত পানি অন্যদের কাছে বিক্রি করে ভালো বাড়তি আয় হচ্ছে।
একই এলাকার কৃষক সাদিকুল রহমান জানান, প্রকল্পের ঋণ ও অনুদান নিয়ে তিনি সোলার সেচ প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। এতে নিজের জমির চাহিদা মিটিয়েও বাণিজ্যিকভাবে আশপাশের আরও ১৫ বিঘা জমিতে নিয়মিত সেচ দিচ্ছেন তিনি। এদিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তিনি সোলার পাম্প বসিয়েছেন, যার মধ্যে আরআরএফ-এর ‘স্মার্ট’ প্রকল্প থেকে পেয়েছেন ৪৫ হাজার টাকার নগদ অনুদান।
সদর উপজেলার বংকিরা গ্রামেও সোলার পাম্পের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান জানান, ইডকলের সহায়তায় তিনি তাঁর ১০ কাঠা জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছেন। একই গ্রামের কৃষক বাবলু ও শহিদুল ইসলাম জানান, সৌরবিদ্যুৎ কাজে লাগিয়ে তারা নিজেরা সুফল পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের কাছে সেচের পানি বিক্রি করছেন। প্রতি বিঘা জমিতে মৌসুমি সেচ বাবদ তারা ৩ হাজার টাকা হারে নিচ্ছেন, যা সনাতন পদ্ধতির চেয়ে অনেকটাই সাশ্রয়ী।
প্রকল্পের সুফল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঝিনাইদহ বিএডিসির প্রকৌশলী সৌরভ কুমার জানান, কৃষি কাজসহ নিত্য ব্যবহারে সোলার খুবই প্রয়োজন। ডিজেল আর বিদ্যুৎ সমস্যার মাঝে ঝিনাইদহের সোলারভুক্ত আওতার কৃষকরা জমিতে পানি দিতে পেরেছে ইচ্ছামতো। বিশেষ করে বিএডিসির আওতাভুক্ত সোলার থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কৃষির চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সংকটেও সোলার মালিকরা ছিলেন নিশ্চিন্তে।
আরআরএফ-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক কৃষিবিদ ড. অসিত বরণ মণ্ডল জানান, আগে যেখানে ডিজেল বা সাধারণ বিদ্যুতে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতো, সোলার পাম্পের কারণে তা ২০০ টাকায় নেমে এসেছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমানে ৩৬টি পাম্প চালু থাকলেও খুব শীঘ্রই জেলায় আরও শতাধিক সোলার পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
