ছবির ক্যাপশন:
সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উপশম নার্সিং হোম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে
সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের ডোপ টেস্ট করা হবে
সিভিল সার্জন সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে
কমিটি অপারেশন থিয়েটারের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করবে
চুয়াডাঙ্গার বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘উপশম নার্সিং হোম’-এ পিত্তথলির পাথর ও টিউমার অপারেশনের সময় ভুল চিকিৎসায় রবগুল মোল্লা (৪৮) নামের এক বিএনপি নেতার করুণ মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল হক তন্ময়ের মালিকানাধীন ক্লিনিকে এই ঘটনা ঘটে। নিহত রবগুল মোল্লা সদর উপজেলার সুবদিয়া গ্রামের খেজমত মোল্লার ছেলে এবং সুবদিয়া ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। রোগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও স্থানীয় উৎসুক জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ক্লিনিকে দফায় দফায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সৃষ্টি হয় তুলকালাম কাণ্ডের।
রোগীর স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার দুপুরে সুস্থ অবস্থায় রবগুল মোল্লাকে উপশম নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। পরদিন শনিবার বেলা ৩টার দিকে তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নেওয়া হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ডা. এহসানুল হক তন্ময় ও একজন অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের অদক্ষতা এবং ওটিতে টেকনিশিয়ান নাজমার মতো অদক্ষ কর্মীর সহায়তায় অস্ত্রোপচার চলাকালেই রোগীর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং তিনি ওটি টেবিলেই মারা যান। ঘটনার পরপরই মৃত্যুর দায় এড়াতে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাকে দ্রুত রাজশাহী নেওয়ার পরামর্শ দেয় এবং একপর্যায়ে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা ওটি থিয়েটার থেকে পালিয়ে যান। রোগীর বোন সখেনা খাতুন বলেন, আমার ভাইকে অপারেশনের সময়ে টেবিলে মেরে ফেলে ডাক্তাররা। অপারেশন চলাকালীন সময়ে ডাক্তার তন্ময় শুধু ছুটাছুটি করছিল। পরে হঠাৎ করে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে চলে যান। পরে জানতে পারলাম রোগী মারা গেছে। রোগীর ভাতিজি চুমকি খাতুন বলেন, আমার চাচার মৃত্যুর সঠিক বিচার চাই। এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়েন স্থানীয় সাংবাদিকেরা। এসময় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রোগীর স্বজনদের সাথেও খারাপ ব্যবহার শুরু করেন। বিশেষ করে ডা. চৈতির ছেলে লাবিব সাংবাদিক ও রোগীর স্বজনদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করেন। এসময় ডা. নুপুরকেও বাজে ব্যবহার করতে দেখা যায়। চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের এরূপ আচরণে রোগীর স্বজনরা বেশি ক্ষুব্ধ হয়। পরবর্তীতে রোগীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলে স্বজনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে শুরু করে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত উত্তেজিত জনতা ও স্বজনরা দুই দফায় ক্লিনিকে তাণ্ডব চালিয়ে আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ভাঙচুর করে। রাত ৮টার দিকে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও চিকিৎসক প্রতিনিধি দল বিষয়টি আপস-মীমাংসার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয় এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে এবং সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে উত্তপ্ত ও থমথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ। তিনি ক্ষুব্ধ স্বজন ও উভয় পক্ষকে শান্ত করে চার দফা সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি জানান— সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উপশম নার্সিং হোম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে, সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের ডোপ টেস্ট সম্পন্ন করা হবে, সিভিল সার্জন সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, যে কমিটি অপারেশন থিয়েটারের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করবে এবং উভয় পক্ষকে নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় বিষয়টির সমাধান করা হবে।
মো. শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, পিত্তথলিতে পাথরের রোগীর অপারেশনের অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার পর আর জ্ঞান ফেরেনি। রোগী মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন লোকজন এসে এখানে ঝামেলা করার কারণে দীর্ঘ সময় এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি অচল অবস্থায় ছিল, বিভিন্ন সময় দফায় দফায় বিভিন্ন ঝামেলা হয়েছে। খবর পেয়ে আমি সরাসরি এখানে উপস্থিত হয়ে এখন মোটামুটি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। যিনি মারা গেছে তার পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। আজকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আগামীকাল দাফন কার্য সম্পন্ন করা হবে। তিনি আরও বলেন, চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জনের সাথে কথা হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এর সমাধান না হবে, এই ক্লিনিক বন্ধ থাকবে এবং যত দ্রুত সম্ভব তার দাফন-কাফনের পরে আমরা সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে এই ক্লিনিকের মালিক ও ডাক্তারসহ আলোচনা করবো। এই ত্রুটিগুলো কী কারণে হলো প্রয়োজনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তার মাধ্যমে যেন পরবর্তীতে কোনো মানুষ এভাবে মারা না যায়। অপারেশন থিয়েটারের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত সুষ্ঠু সমাধান না হবে এই ক্লিনিক বন্ধ থাকবে এবং সুষ্ঠু সমাধানের পর পুনরায় চালু হবে।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মারুফ রহমান ঘটনাস্থলে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
