রোগীর খাবার ও প্যাথলজি বিভাগে অনিয়ম দেখে ক্ষোভ

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এডিজির আকস্মিক পরিদর্শন

‘আপনি যা করছেন, এগুলো ক্রাইম’- হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ককে এডিজি

আপলোড তারিখঃ 2026-09-10 ইং
রোগীর খাবার ও প্যাথলজি বিভাগে অনিয়ম দেখে ক্ষোভ ছবির ক্যাপশন:

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান। গতকাল বুধবার রাতে তিনি আকস্মিকভাবে হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। এসময় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, আইসিইউ, জরুরি বিভাগ, ওষুধ সংরক্ষণ কক্ষ ও প্যাথলজি বিভাগ ঘুরে দেখেন তিনি। পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসকদের উপস্থিতি এবং খাবার সরবরাহের বিষয়েও খোঁজখবর নেন।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান জানান, আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল পরিদর্শনের কথা ছিল। তবে বিশেষ কারণে তাঁকে ঢাকায় যেতে হবে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই গতকাল বুধবার রাতে আকস্মিকভাবে হাসপাতালে উপস্থিত হন তিনি।


এদিকে, এডিজির আকস্মিক আগমনের খবর পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত হতে দেখা যায়। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়।


পরিদর্শনকালে এডিজি অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ড, আইসিইউ, জরুরি বিভাগ ও ওষুধ সংরক্ষণ কক্ষ ঘুরে দেখেন। তিনি চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের চিকিৎসাসেবার বিষয়ে খোঁজ নেন। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা নিয়মিত আসছেন কি না, রোগীরা যথাযথ খাবার পাচ্ছেন কি না- এসব বিষয়েও তিনি রোগীদের কাছে জানতে চান।
পরিদর্শনের সময় রোগীদের খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনিয়ম তাঁর নজরে আসে। খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে রোগীদের খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের বিষয় তিনি জানতে পারেন। এসময় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানিকে এডিজি বলেন, ‘আপনাকে আরএমও রাখা হয়েছে তো এসব অনিয়ম ধরার জন্য। আপনি ঠিকাদারদের অনিয়মগুলো ধরে আমাদের দেন। আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’


পরে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাসকে রোগীদের খাবারে মাছ, মাংসের পরিমাণ কম দেওয়াসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে নিয়মিত তদারকি করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এডিজি।


তিনি বলেন, ‘আপনাদের এখানে ঠিকাদাররা ওজনে মাংসে কম দিচ্ছে। এ বিষয়ে আপনারা কালকেই ব্যবস্থা নেবেন। এমন চলতে থাকলে আপনিই বিপদে পড়বেন। নিয়ম অনুযায়ী সব কাজ করবেন। আপনি কালকেই ব্যবস্থা নিয়ে জানাবেন, আসলেই ওজনে কম দেয় কি না তারা।’ এসময় এডিজি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রোগীদের খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে অনুসরণ এবং ঠিকাদারদের কার্যক্রম তদারকির ওপর গুরুত্ব দেন।


এরপর এডিজি অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ পরিদর্শন করেন। সেখানে বিভিন্ন খাতাপত্র ও কার্যক্রম পর্যালোচনার সময় বেশ কিছু অনিয়ম তাঁর নজরে আসে। পাশাপাশি প্যাথলজি বিভাগে তুলনামূলকভাবে পরীক্ষা করতে আসা রোগীর সংখ্যা কম থাকায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় তিনি বলেন, ‘জেলার একটি হাসপাতালে মাত্র ৩৯টা প্যাথলজি হয়, এটা করার তো দরকারই নেই।’


প্যাথলজি পরীক্ষা কম হওয়ায় হাসপাতালের সরকারি ব্যয়ের বিষয়টি ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করে এডিজি বলেন, সামান্যসংখ্যক রোগীর জন্য হাসপাতালে খরচ না করে সরকারি খরচে বাইরে ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্যাথলজি পরীক্ষা করানো যেতে পারে। এতে সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে রোগীদের পথ্য ও ওষুধ কেনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।


তিনি বলেন, ‘এই সামান্য কয়টা রোগীর জন্য হাসপাতালে খরচ না করে সরকারি খরচে বাইরে ক্লিনিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের প্যাথলজি করা হোক। আর বাকি টাকা দিয়ে আমরা রোগীদের পথ্য-ওষুধ কিনব।’ প্যাথলজি বিভাগের বিভিন্ন খাতাপত্র পর্যালোচনা করার সময়ও নানা অনিয়ম দেখতে পান এডিজি। খাতায় তথ্য লেখা থাকলেও সেখানে সংশ্লিষ্টদের স্বাক্ষর না থাকায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় তিনি বলেন, ‘আপনারা খাতায় যা লিখেছেন, এগুলো বানিয়ে লিখেছেন ঠান্ডা মাথায়। কোনো স্বাক্ষর নেই।’


প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম ও আয় বাড়ানোর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিশেষ করে হাসপাতালের অটোমেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত একই ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকবে কি না- তা জানতে চান এডিজি।


হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের অটোমেশন না হওয়া অবধি কি এমনটাই চলতে থাকবে- ৩০ থেকে ৩৯টি প্যাথলজি? রেভিনিউ বাড়াতে কি কোনো ব্যবস্থা নেবেন না আপনারা?’ এসময় প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রমে অনিয়ম ও দায়িত্ব পালনের ঘাটতি নিয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘আপনি যা করছেন, এগুলো ক্রাইম। আর এর জন্য দায়ী আপনিই।’


এসময় হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এডিজি অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান।


পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এডিজির পিএস শুভ, চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আওলিয়ার রহমান, সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. মো. এহসানুল হক তন্ময়, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক (গাইনি) ডা. আকলিমা খাতুন, সিনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থো-সার্জারি) ডা. মো. আব্দুর রহমান, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফারহানা ওয়াহিদ, মেডিকেল অফিসার শাপলা খাতুন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. মো. আসাদুর রহমান মালিক, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকের অফিসার সাজিদ হাসানসহ সদর হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকের অফিসারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ।


এদিকে, হাসপাতাল পরিদর্শনকালে শেষে এডিজি ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, 'চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে কবে আমরা পূর্ণ জনবল দিতে পারব, তা এখনই বলা মুশকিল। কারণ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা অনেকটা হ-য-ব-র-ল। এখানে শয্যা, লোকবল ও খাদ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। তবে সরকার খুব শিগগিরই সারাদেশে ৫ হাজার চিকিৎসক এবং ৪৫ হাজার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেবে। ইতোমধ্যে ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৮টি জেলায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আশা করি, ধারাবাহিকভাবে চুয়াডাঙ্গাতেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।'


তিনি আরও বলেন, 'আমরা নিয়মিত হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করি, যাতে চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করা যায় এবং রোগীরা যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতে পারেন। স্বাস্থ্য বিভাগে আমরা যারা দায়িত্বে আছি, তারা যদি স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসাসেবার মানের উন্নয়ন সম্ভব।'

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)