পুঠিয়া রাজবাড়ী: রাজকীয় অতীতের নীরব সাক্ষী

আপলোড তারিখঃ 2026-08-18 ইং
পুঠিয়া রাজবাড়ী: রাজকীয় অতীতের নীরব সাক্ষী ছবির ক্যাপশন:

রাজশাহীর পুঠিয়া-নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রাচীন রাজবাড়ি, দৃষ্টিনন্দন মন্দির, বিশাল দিঘি আর টেরাকোটার অপূর্ব কারুকাজ। ইতিহাস ও স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদ যেন আজও বহন করে চলেছে কয়েকশ বছরের অতীতের গল্প। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পুঠিয়া উপজেলা। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক পুঠিয়া রাজবাড়ী, যা স্থানীয়ভাবে ‘পাঁচআনি রাজবাড়ী’ নামেও পরিচিত। পুঠিয়ার জমিদারির ইতিহাস শুরু হয় মোগল আমলে। কথিত আছে, নীলাম্বর মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৭৪৪ সালে জমিদারি ভাগ হয়ে যায় এবং পুঠিয়া রাজপরিবারের প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
তবে জমিদারি শেষ হলেও ইতিহাস শেষ হয়নি। বরং প্রাসাদ, মন্দির, দিঘি ও নানা স্থাপনার মধ্য দিয়ে পুঠিয়ার সেই অতীত আজও জীবন্ত। বর্তমান পুঠিয়া রাজবাড়ী নির্মিত হয় ১৮৯৫ সালে। মহারাণী হেমন্তকুমারী দেবী তাঁর শাশুড়ি মহারাণী শরৎসুন্দরী দেবীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। স্থাপনাটিতে ইন্দো-সারাসেনিক ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
দ্বিতল প্রাসাদের সামনে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা, উঁচু স্তম্ভ এবং নান্দনিক অলংকরণ। ভবনের নকশায় ইউরোপীয় ধাঁচের কলাম ও বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির সমন্বয় এটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। রাজবাড়ীর পুরো কমপ্লেক্সটি একসময় পরিখা ও বিস্তৃত প্রাঙ্গণে ঘেরা ছিল। প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে ছিল কাছারি, মন্দির অঙ্গন, অন্দরমহল এবং রাজপরিবারের আবাসিক অংশ।
পুঠিয়ার বিশেষত্ব শুধু রাজবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজবাড়িকে ঘিরে রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক মন্দির ও স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচরত্ন গোবিন্দ মন্দির, বড় শিবমন্দির, ছোট গোবিন্দ মন্দির, জগদ্ধাত্রী মন্দির ও দোলমঞ্চসহ নানা স্থাপনা। এসব মন্দিরের দেয়ালে দেখা যায় অসাধারণ টেরাকোটার কাজ। কোথাও পৌরাণিক কাহিনি, কোথাও তৎকালীন মানুষের জীবনযাত্রা, আবার কোথাও পশুপাখি ও নানা সামাজিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে এগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়-বাংলার অতীত সমাজ ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
বিশেষ করে পাঁচরত্ন গোবিন্দ মন্দিরের টেরাকোটা অলংকরণ দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। মন্দিরের দেয়ালের পোড়ামাটির ফলকে রামায়ণ-মহাভারত ও কৃষ্ণ-রাধার নানা কাহিনির পাশাপাশি সমকালীন জীবনের বিভিন্ন চিত্রও ফুটে উঠেছে। সময় বদলেছে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। রাজপরিবারের সেই জৌলুসও নেই। কিন্তু পুঠিয়ার প্রাসাদ ও মন্দিরগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। স্থাপনাগুলোর বয়স ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেরাকোটার মতো সূক্ষ্ম ঐতিহ্যবাহী অলংকরণ রক্ষায় নিয়মিত সংরক্ষণ ও যথাযথ পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক জায়গায় রাজবাড়ি, প্রাচীন মন্দির, দিঘি, টেরাকোটা আর ঐতিহাসিক স্থাপত্য—সবকিছুর সমন্বয় পুঠিয়াকে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহ্যভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত করেছে। এখানে দাঁড়ালে মনে হয়, কয়েকশ বছর আগের কোনো এক সময়ের দরজা যেন হঠাৎ খুলে গেছে। পুরোনো প্রাসাদের দেয়াল, মন্দিরের পোড়ামাটির কারুকাজ আর চারপাশের পরিবেশ মিলিয়ে পুঠিয়া যেন একটি জীবন্ত ইতিহাসের বই।
পুঠিয়া রাজবাড়ী তাই শুধু একটি পুরোনো প্রাসাদ নয়-এটি বাংলার জমিদারি ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য স্মারক। সময় যত গড়াবে, পুঠিয়ার রাজবাড়ি ও মন্দিরগুলো ততই আমাদের মনে করিয়ে দেবে-ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; ইতিহাস কখনো কখনো ইট-পাথর, পোড়ামাটি আর পুরোনো স্থাপনার দেয়ালেও বেঁচে থাকে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)