ছবির ক্যাপশন:
আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
কুমিল্লার লাকসামে সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপি সভাপতি সাইফুল ইসলাম হিরু এবং পৌর বিএনপি সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজকে গুম ও হত্যা মামলার অন্যতম এজাহারনামীয় আসামি উপপরিদর্শক (এসআই) অসিত কুমার রায় বর্তমানে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু থানায় কর্মরত রয়েছেন। তিনি এখন ওসি তদন্ত হিসেবে কর্মরত।
অভিযোগ উঠেছে, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম ও নির্যাতনের অন্যতম কারিগর এই পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও হরিণাকুণ্ডু থানায় বহাল তবিয়তে থেকে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশকে পরিবেষ্টিত করে তিনি এখন এলাকায় সশস্ত্র চরমপন্থী, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। এই অপকর্মের সিন্ডিকেটে তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন একই থানার এসআই বিপুল ও শ্যামাপ্রসাদ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন **হরিণাকুণ্ডু** থানায় ওসি না থাকার সুবাদে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর বিএনপির টানা অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে কুমিল্লার লাকসামে যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে এক ভয়াবহ গুমের ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাত ৯টার দিকে র্যাব ও পুলিশের যৌথ দল সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরুর মালিকানাধীন 'লাকসাম ফ্লাওয়ার মিলে' অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে আটক করে। অভিযানের খবর পেয়ে সাইফুল ইসলাম হিরু, হুমায়ুন কবির পারভেজ ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লার দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের লালমাই উপজেলার হরিশ্চর-আলীশ্বর এলাকায় সাদা পোশাকধারী র্যাব পরিচয়ে তাঁদের গতি রোধ করে এবং একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। সেই টিমে ছিলেন এসআই অসিত কুমার রায়।
ওই দিন মধ্যরাতে জসিম উদ্দিন ও আটক হওয়া অন্য ৯ জনকে লাকসাম থানায় হস্তান্তর করা হলেও হিরু ও হুমায়ুন কবিরকে আর ফেরত দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ১৮ মে হুমায়ুন কবিরের বাবা রঙ্গু মিয়া বাদী হয়ে কুমিল্লা আদালতে র্যাব-১১-এর ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
চাঞ্চল্যকর এই মামলার আসামিরা হলেন নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত র্যাব -১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কোম্পানি অধিনায়ক মেজর শাহেদ হাসান (রাজীব), ডিএডি শাহজাহান আলী, এসআই কাজী সুলতান আহমেদ এবং বর্তমানে হরিণাকুণ্ডু থানায় কর্মরত এসআই অসিত কুমার রায়।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ছেলে হারানোর শোকে ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট মামলার মূল বাদী রঙ্গু মিয়া মারা যান। বর্তমানে মামলাটি পরিচালনা করছেন তাঁর ছোট ছেলে গোলাম ফারুক। দীর্ঘ ১১ বছরে পুলিশ, সিআইডি এবং পিবিআই একের পর এক মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে সময়ক্ষেপণ করলেও অভিযুক্ত কোনো কর্মকর্তাকে একবারের জন্যও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে এই মামলার যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত জমা দেওয়া হয়েছে।
গুমের ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জসিম উদ্দিন জানান, "আমাদের তিনজনকে আটকের পর চোখ বেঁধে ফেলা হয়েছিল। গভীর রাতে লাকসাম থানায় আমার চোখ খোলা হলে দেখি হিরু ভাই ও হুমায়ুন ভাই নেই। র্যাবই তাঁদের গুম করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।"
নিখোঁজ হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার এবং সাবেক এমপি হিরুর ছেলে রাফসাল ইসলাম অভিযোগ করেন, র্যাব -১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক তারেক সাঈদ ও তাঁর সহযোগী এসআই অসিত কুমার রায় সহ অভিযুক্তরা এই গুমের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের নির্দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতে এই শীর্ষ দুই নেতাকে গুম করা হয়েছিল।
এদিকে, এত বড় চাঞ্চল্যকর গুম ও হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি হওয়া সত্ত্বেও এসআই অসিত কুমার রায় কীভাবে হরিণাকুণ্ডুর থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বহাল থাকেন এবং থানা এলাকার অপরাধীদের মদদ দিয়ে যান তা নিয়ে ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও চাকরি থেকে বরখাস্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল।
এদিকে ঝিনাইদহের একদল সাংবাদিক হরিণাকুণ্ডু থানায় বক্তব্য নিতে গেলে অসিত কুমার রায় তাদের হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ। তিনি বলেন, থানার কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য নিতে হলে স্থানীয় প্রেসক্লাবের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া অসিত কুমার রায় থানা সংলগ্ন মার্কেটে তিথি রানী নামে এক নারী কনস্টেবলকে দিয়ে ‘শ্রেয়স ডিজিটাল সেন্টার’ দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ।
এ বিষয়ে হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি (তদন্ত) অসিত কুমার রায় গুম ও হত্যা মামলার আসামি কি না জানতে চাইলে তিনি চুপসে যান এবং বলেন, ‘এ কথা মোবাইলে বলা যাবে না। তবে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভিডিও চিত্রে হত্যা মামলার আসামির কথা স্বীকার করেন।’
হরিণাকুণ্ডু থানার নবাগত ওসি জুলফিকার আলী জানান, ‘তিনি নতুন এসেছেন। অসিত রায় সাক্ষ্য দিতে গেছেন। তার সঙ্গে আমার এখনো সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি বিএনপি নেতা গুম ও হত্যা মামলার আসামি কি না তাও জানি না।’
