ছবির ক্যাপশন:
বিপুল জনসংখ্যা বা অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি খাতে গুরুতর সংকটের সৃষ্টি করছে। অসমঞ্জস্যপূর্ণ এই বৃদ্ধির ফলে খাদ্য ঘাটতি, বাসস্থান সংকট এবং পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ ফেলে এবং বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। খাদ্যের অপর্যাপ্ততা এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাবে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগ বাড়ছে।অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বস্তির সংখ্যা বাড়ছে, যা মৌলিক মানবাধিকার ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ বসবাস করায় পানি, বিদ্যুৎ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ধস নামছে।
সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবা গ্রহীতাদের ভিড় বাড়ার কারণে মাথাপিছু সেবার মান ও প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। দরিদ্র পরিবারগুলোতে অনেক সন্তান থাকায় শিক্ষার সুযোগ থেকে অনেকে বঞ্চিত হয়। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যার অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় তীব্র বেকারত্ব ও কম মজুরির সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টন কঠিন হয়ে পড়ে, যা ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আরো বাড়িয়ে দেয়। দেশে শুধু মানুষ আর মানুষ। কি গ্রাম, কি শহর- সর্বত্র মানুষের চাপ। এই বিপুল জনসংখ্যা তৈরি করছে বিভিন্ন সংকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো (বিবিএস) বলছে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৭৮ লাখ। প্রতি বছর মানুষ বাড়ছে এক দশমিক ২২ শতাংশ হারে। তাতে এক বছর পরে বর্তমান জনসংখ্যার সঙ্গে আরো প্রায় ২০ লাখ মানুষ যুক্ত হবে। ২০৩৬ সালে বাংলাদেশের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ২০ কোটিতে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সতর্ক ও সচেতন না হলে ভবিষ্যতে শুধু বিপুল জনসংখ্যার কারণেই বাংলাদেশের অগ্রগতি সংকটের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র আয়তনের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের ঊর্ধ্বগতি একটি অশনিসংকেত। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক ও মানবউন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।মনে রাখতে হবে, বেশি জনসংখ্যার জন্য প্রথমেই দরকার বেশি খাদ্য। দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ অর্থ বছরে জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি ৪০ লাখ।
বিবিএসের তথ্য, ওই বছর চাল উৎপাদিত হয়েছিল ৯৯ লাখ টনের কিছু বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে উৎপাদন চার কোটি ছয় লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ চালের উৎপাদন বেড়েছে চার গুণের বেশি। কিন্তু চাল এখনো আমদানি করতে হচ্ছে। দামও চড়া।স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। তবে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। খাদ্য কিনতে তাদের সরকারি ট্রাকের পেছনে দাঁড়াতে হয়।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করলেও খাদ্য নিরাপত্তা এখনো উদ্বেগের বিষয়।বিবিএসের হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ১০ হাজার। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্য অবশ্য বলছে, গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে কেবল ৮৭ লাখের। বাকি প্রায় ৫৩ লাখ কাজে বাইরে থেকে গেছেন। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিপুলসংখ্যক তরুণকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করা যাচ্ছে না।
জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সংকট দেশের অর্জিত উন্নয়নকে ভস্মুর করে তুলবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্ভাবনার অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে। সে অবস্থায় জনসংখ্যা বাংলাদেশের সম্পদ না হয়ে দায় হয়ে উঠবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ জরুরি।
