ছবির ক্যাপশন:
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে আয়োজনের আইনে পুনরায় ফিরে আসার পর বিধিমালা প্রণয়ন করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বছর অক্টোবরেই নির্বাচন শুরু করতে চায় সংস্থাটি। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা বাড়ায় উদ্বেগও বাড়ছে। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন দল তাদের প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে। আবার দলগুলোর নেতারাও স্থানীয়ভাবে ব্যানার, পোস্টারে নিজেদের প্রার্থিতার প্রচার শুরু করেছেন। এতে আন্তঃদলীয় কোন্দল ভোটের সময় সহিংসতায় গড়াতে পারে। অতীতে এমন নজির রয়েছে। এ নিয়ে খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমএম নাসির উদ্দিনও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন হরহামেশাই।
যা বলছে ইসি: সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার হবে না। তবুও বিভিন্ন দল মনোনয়নের ঘোষণা দিচ্ছে। এটার জন্য চিন্তার ভাঁজ পড়েছে আমার কপালে। সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে পার্টির মালিকানা থাকত না, দলে দলে দঙ্গল থাকত না। দলগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, রক্তপাতহীন একটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেখতে চাই। অতীতে দেখা গেছে, অনেক মার্ডার হয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে এটা বোঝাপড়া করা উচিত যে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ঝামেলায় যাব না। সারা দুনিয়ার সভ্য দেশের মতো নির্বাচন যেন আমরা করতে পারি তেমন একটা সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। সেখানে আপনাদের (রাজনৈতিক দলগুলোর) মধ্যে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং দরকার। রাজনৈতিক দলগুলো বসে একটা ফয়সালা করেন।
দলীয়-নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচনে ইতিবৃত্ত: ২০১৪ সালে জুন-জুলাই মাসে সাত ধাপে ৪৮৬ উপজেলার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে সময়কার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গেলে ভারপ্রাপ্ত সিইসির দায়িত্ব পালন করেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক। পাঁচটি ধাপের নির্বাচন তার তত্ত্বাবধানেই অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হলেও দলীয় সমর্থনে ভোট হয়। এতে শতাধিক ব্যক্তি সহিংসতায় প্রাণ হারান। পঞ্চম ধাপের ভোট শেষে ওই বছর ৩১ মার্চ আবদুল মোবারক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ...প্রথমবার (উপজেলা) নির্বাচনে বড় বড় দলগুলো দলীয়ভাবে হওয়ার বিরোধিতা করেছে। এখন তারা আবার দলীয়ভাবে নির্বাচন চাচ্ছে। যদি এমনই চেয়ে থাকেন, তবে আইনের মধ্যে ব্যবস্থা করলে আরো ভালো হতো। আশাকরি, ভবিষ্যতে তারা আইন প্রণয়ন করবেন, তারা এ নিয়ে ভাববেন। কারণ এতে অনেক হানাহানি হয়, প্রাণহানি হয়। নির্বাচন স্থগিত হলে আবার নির্বাচন করতে হয়। তিনি বলেন, যারা জনমত গঠন করেন, আপনারা এ নিয়ে ভাবুন। এবারের নির্বাচন কোনোমতে পার করে দেওয়া হলো। আগামী নির্বাচনে যেন এ নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়। পরবর্তীতে দশম জাতীয় সংসদেই স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে সম্পন্ন করার আইন হয়। এরপর ২০১৬ সাল থেকে সকল স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়। তবে দলীয়ভাবে স্থানীয় হওয়ায় বিগত ১০ বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়াও অন্য দলের কেউ আর সেভাবে উঠে আসতে পারেনি। স্থানীয় সরকারেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হার বেড়ে গিয়েছিল। মূলত, স্থানীয় সরকারগুলোও একটি দলের প্রতিনিধিরাই চালিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে অন্তর্বর্তী সরকার এসে নির্বাচন বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাদেশের মাধ্যমে ফের নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধান আনা হয়। সম্প্রতি যা আইনে রূপান্তর করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা: ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবরে অবসরে যান ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী। তিনি ওই সময় নির্বাচন পরিচালনা শাখার দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচন বিষয়ক সংস্কার কমিটির অন্যতম সদস্য হন। তিনি বলেন, আমাদের যে নির্বাচনি সংস্কৃতি, এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচন নির্দলীয় হলেও কিন্তু দেখা গেছে, দলগুলোর একটা সমর্থন ছিল। আর এ বিষয়টাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এখন যেহেতু সে সময়ের মতো আবার নির্দলীয় নির্বাচনের আইনে ফিরে যাওয়া হয়েছে, দলগুলোকে সেটা মানতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে আইন না মানার পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে নির্বাচন কমিশন ও দলগুলোর মধ্যে বিরাজমান দূরত্ব। সেটা কাটিয়ে উঠতে হবে। এজন্য আলোচনার দরকার। কমিশনকে বলতে হবে নির্দলীয় নির্বাচন। আপনারা দলীয়ভাবে কাউকে সমর্থন দেবেন না। দলগুলোরও উচিত হবে এটা এভয়েড করা।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ক কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল আলীম বলেন, সহিংসতা বিষয়টি দু’টো বিষয়ের ওপরেই হতে পারে। দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে কী হয়, দেখা যায় কোনো একটি এলাকায় মন্ত্রীর প্রার্থী থাকে, এমপির প্রার্থী থাকে, আবার স্থানীয় বড় নেতাদেরও প্রার্থী থাকে। তখন কিন্তু নিজেদের মধ্যেই সহিংসতার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে নির্দলীয় নির্বাচন হলেও হতে পারে। এখানে সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকে। এক্ষেত্রে দলগুলো যদি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়, তখন সমস্যাটার সৃষ্টি হয়। ২০১৬ সালে যখন দলীয়ভাবে নির্বাচনের আইন হলো-এরপর কিন্তু সহিংসতা আর কমেনি। বরং বেড়েছে। কারণ তখন একই এলাকার মন্ত্রী, এমপিরা প্রার্থী দিয়েছেন। একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। অনেক দলই প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে-এমন বিষয় সামনে আনলে তিনি বলেন, এটাই সমস্যা। আইনে আছে নির্দলীয় নির্বাচন হবে। কাজেই দলগুলোর উচিত হবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না দেওয়া। এক্ষেত্রে আইনে বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ নেই। যদি আইনে থাকতো যে দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া যাবে না, তাহলে তারা এটি করতে পারতো না।
এই নির্বাচন পর্যবেক্ষক সুপারিশ রেখে আরো বলেন, আইনের ভেতরেই বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিংবা এখন তো বিধিমালা করবে নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনও চাইলে বিধিমালায় স্পষ্ট করতে পারে, যে দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় নির্বাচন বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। আমরা সকল বিষয় পর্যালোচনা করে দেখছি।
