ছবির ক্যাপশন:
রাজস্ব আহরণ, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয়, জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থা এবং সরকারি নিরীক্ষা কার্যক্রমকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করে তুলতে নেয়া হয়েছে ‘স্ট্রেনদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (সিটা)’ প্রকল্প। সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে নেয়া এই প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রায় ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এই অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের সরকারি প্রশাসনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে একযোগে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, গত ১২ জুন প্রকল্পটির জন্য ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করা হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
যদিও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সরকারি সেবা, ডিজিটালাইজেশন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবু সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, কর প্রশাসন, সরকারি ক্রয়, নিরীক্ষা ও তথ্যব্যবস্থায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা উন্নয়নের গতি ব্যাহত করছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতেই একীভূত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংক। সিটা প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করা হবে, যাতে সরকারি নীতিনির্ধারণে আরও নির্ভুল ও মানসম্মত তথ্য ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে স্বয়ংক্রিয় কর প্রশাসন, ই-ইনভয়েসিং এবং সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে কর পরিপালন বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করা হবে। পরিকল্পনা বিভাগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ, ডিজিটাল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের ই-জিপি প্ল্যাটফর্মকে আরও উন্নত করে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং ব্যয়ের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে নিরীক্ষা কার্যক্রম ডিজিটাল করা হবে, যাতে বর্তমানে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশে গড়ে ৭২ মাস সময় লাগলেও তা কমিয়ে ৯ মাসে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, প্রকল্পটি শুধু প্রযুক্তি স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্যের ব্যবহার, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিকল্পনা বিভাগের জন্য নেয়া উদ্যোগের আওতায় প্রকল্প পরিকল্পনা, মূল্যায়ন, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সনদভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু এবং ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়নের জন্য লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ শক্তিশালীকরণ, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তর, সরকারি নিরীক্ষা আধুনিকীকরণ এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে ‘স্ট্রেনদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (সিটা)’ কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য পৃথকভাবে নেয়া হয়েছে আইপিআইএমএস প্রকল্প।
প্রথম প্রকল্প ‘পরিসংখ্যান সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন প্রকল্প (এসসিইএমপি)’ বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধীন এ প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৯৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে আইডিএ ৮ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ দিচ্ছে। দ্বিতীয় প্রকল্প ‘দেশীয় রাজস্ব আহরণ শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (এসডিআরএমপি)’ বাস্তবায়ন করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। তৃতীয় প্রকল্প ‘জনসেবা উন্নয়নে সরকারি ক্রয় আধুনিকায়ন প্রকল্প (পিএমআইপিএসডি)’ বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের ব্যয় ৫৫১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। চতুর্থ প্রকল্প ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারি নিরীক্ষা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (এসপিএডিটিইসি)’ বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৩১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে সরকারি নিরীক্ষা কার্যক্রমকে ডিজিটাল করা, নিরীক্ষার মান উন্নয়ন এবং আর্থিক জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পঞ্চম প্রকল্প ‘সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প (আইপিআইএমএস)’ বাস্তবায়ন করবে পরিকল্পনা বিভাগের এনইসি-একনেক ও সমন্বয় উইং। প্রকল্পটির ব্যয় ৩১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল, আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা। নিরীক্ষা পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরির প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, কম্পিউটার সহায়তায় নিরীক্ষা কৌশল, নিরীক্ষা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা ইকোসিস্টেম এবং মহাহিসাব নিরীক্ষকের জন্য সমন্বিত ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হবে। এছাড়া নিরীক্ষা মান, নির্দেশিকা ও ম্যানুয়াল হালনাগাদ করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, অবকাঠামো, পরিবেশ এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার মতো বিশেষায়িত খাতে পৃথক নিরীক্ষা নির্দেশিকা তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক নিরীক্ষা পরিচালনার জন্য আধুনিক নিরীক্ষা কৌশল চালু করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে একটি আধুনিক ডিজিটাল নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। নিরীক্ষা কার্যক্রমের গতি বাড়বে, প্রতিবেদন তৈরিতে সময় কমবে এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত হবে। এর ফলে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
