ছবির ক্যাপশন:
'উন্নত দেশের সোপান ধরি, মাদকমুক্ত দেশ গড়ি' প্রতিপাদ্যে চুয়াডাঙ্গায় নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে পালিত হয়েছে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস-২০২৬। গত শুক্রবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্যদিয়ে দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয়। র্যালিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বের হয়ে শহরের কোর্টমোড় প্রদক্ষিণ করে পুনরায় একই স্থানে এসে শেষ হয়। এসময় মাদকবিরোধী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন নাগরিকরা অংশ নেন। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণের মুক্তমঞ্চে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বি এম তারিক-উজ-জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, মাদক নিয়ে বিভিন্ন সময় সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্তমান সময়ে মাদকের ভয়াবহতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় মাদকের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। উল্লেখ করে তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাদকের বিস্তারও বেড়েছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ওপর পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যখনই মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলি, তখন সবার আগে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। সন্তান কখন বাড়ি ফিরছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী করছেÑএসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। অভিভাবকরা সচেতন হলে মাদকাসক্তি নির্মূলে কার্যকর পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মাদকের টাকার জন্য সন্তানরা নিজ পিতা-মাতার ওপর নির্যাতন করছে এবং জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে। এটি সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বিষয়।
মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "চুয়াডাঙ্গার সুশীল সমাজ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়েও এ ধরনের সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। অভিভাবকদের সচেতন করতে পারলে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হবে।"
তিনি বলেন, মাদক পাচারকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত কাজ করছে। বর্তমানে জেলা পুলিশ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সফলতা অর্জন করেছে। যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, "অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই মাদক সম্পর্কে নেতিবাচক ও ভীতিকর ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন।"
তিনি বলেন, "একজন কিশোর বা যুবক প্রথমবার যখন মাদক গ্রহণ করে, তখন সাধারণত তা গোপনেই করে থাকে। সেই শুরুটাকেই যদি প্রতিরোধ করা যায়, পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি সতর্ক ভূমিকা পালন করে এবং মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়, তাহলে মাদকাসক্তি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।"
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বি এম তারিক-উজ-জামান বলেন, চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি বারবার একই ধরনের অভিযোগ পেয়েছি। অনেক অভিভাবক সন্তানদের মাদকাসক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন।
তিনি বলেন, "আমি যখন সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতাম, তখন অনেক অভিভাবক আমার কাছে এসে তাদের সন্তানদের বিপথগামিতা ও মাদকাসক্তির কথা বলতেন। চুয়াডাঙ্গাতেও আমরা প্রায় প্রতি সপ্তাহে একই ধরনের অভিযোগ পাই। অভিভাবকরা বলেন, 'আমাদের সন্তানদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান।'"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের সবারই সন্তান আছে। আমরা যদি নিজেদের সন্তানদের প্রতি সচেতন হই, তাহলে সমাজ থেকে মাদকসেবী, মাদক বিক্রেতা ও মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রতিহত করা সম্ভব। কিন্তু এখন যদি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।"
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং মাঠ প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে সফল হওয়া সম্ভব নয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমেই মাদকের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা সম্ভব।
আলোচনা সভা শেষে দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে সহকারী কমিশনার আবদুল্লাহ আল শামীমের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মিনহাজ উল ইসলাম, সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিথি মিত্র, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মারুফ সরোয়ার বাবু, সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মিজানুর রহমান এবং চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান।
এছাড়া অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মাদকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনের সদস্য এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ঝিনাইদহ জেলাব্যাপী মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গ্রামেগঞ্জের তরুণ, যুবক, কিশোর, এমনকি শিশুরাও এই মরণনেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই 'মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধ ও পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস' পালিত হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে গত শুক্রবার সকালে জেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ আয়োজনে এক বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। এতে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন, পুলিশ সুপার মিয়া মো. আশীষ হাছান, জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদ, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মোজাম্মেল করিম, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মিথিলা ইসলাম ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ মোঃ হাশেম আলীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
এদিকে 'মুক্ত দেশ চাই, সোনার বাংলা গড়তে চাই' প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে এক মানববন্ধনের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামীর যুব ও ক্রীড়া বিভাগ। ব্যানার-ফেস্টুন হাতে নিয়ে এই কর্মসূচিতে সংগঠনটির জেলা নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধন শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ইসমাইল হোসেন, শহর শিবিরের সভাপতি শেখ আল আমিন, যুবনেতা মেহেদী হাসান রাজু, শহর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সভাপতি আসাদুজ্জামান আল মাহবুব এবং সদর উপজেলা যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সেক্রেটারি নাজমুল হোসেন।
বক্তারা বলেন, মাদক সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি ভয়াবহ অভিশাপ। এই মরণব্যাধি নির্মূলে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা।
