ছবির ক্যাপশন:
‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’ রোমান সেনাপতি ও সম্রাট জুলিয়াস সিজারের সেই ঐতিহাসিক উক্তির মতোই ঘটলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর। মাত্র ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত নিবিড় এক কূটনৈতিক সফরে মালয়েশিয়া জয় করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন তিনি। গতকাল সোমবার সফর সমাপ্তি শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৮ ঘণ্টার এই সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে, যা আগামী দিনে দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ইতিমধ্যে ৯টি বিষয়ে ৩৩টি পয়েন্টে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনিন্দ্য সুন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিধর দ্বীপ রাষ্ট্র মালয়েশিয়ায় সফরটি নানা কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দেওয়া, আটকে পড়া প্রবাসীদের মুক্ত করা, বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার করা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী খোলামেলা আলোচনা করেছেন। এদিকে মালয়েশিয়া সফর শেষ করে গতকাল স্থানীয় সময় বিকেলে চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা। আজ মঙ্গলবার সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) এক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ২৬ জুন তার বাংলাদেশে ফেরার কথা রয়েছে।
গত রোববার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সফরের দ্বিতীয় দিন গতকাল সোমবার সকালে কুয়ালালামপুরের পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে এক একান্ত ও দ্বিপাক্ষিক সীমিত বৈঠকে মিলিত হন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে- সাংস্কৃতিক সহযোগিতা তথা দুই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা তথা বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতা জোরদার করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ (ইওএন) বিনিময় করা হয়। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) তথা দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করার জন্য একটি ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) বিনিময় করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী দাতো সেরি উতামা হাজি মোহাম্মদ বিন হাজি হাসান নিজ নিজ দেশের পক্ষে দলিল বিনিময় করেন।
আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ:
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। গতকাল সোমবার দুপুরে পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাসভবনে এই মধ্যাহ্নভোজ হয়। মধ্যাহ্নভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ছিলেন তার সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান। এরপর ভবনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় সেখানে মালয়েশিয়ার শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানে স্কুলের শিক্ষার্থীরা ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ গান’টি পরিবেশ করে। দুই প্রধানমন্ত্রীসহ তাদের সহধর্মিনীরা এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান ভবন থেকে নেমে আসলে প্রবেশ পথের দুই পাশে মালয়েশিয়ার শিশু-কিশোররা বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকা হাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান শিশুদের সাথে কথা বলেন এবং তাদেরকে শুভেচ্ছা জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে থাকা গাড়ির সামনে এসে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার সহধর্মিণী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিনীকে বিদায় জানান। তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান মোটর শোভাযাত্রা সহকারে কুয়ালালামপুরে শাংগ্রি লা হোটেলে যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আগে থেকেই কয়েকটি নির্ধারিত কর্মসূচি থিল।
মালয়েশিয়ার শীর্ষ করপোরেট জায়ান্টের সাথে বৈঠক:
১৮ ঘণ্টার এই ঝটিকা সফরেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চাকাকে গতিশীল করতে হোটেল শাংগ্রি লা-তে মালয়েশিয়ার ৫টি শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে বিশেষ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- পেট্রোনাস (জ্বালানি খাত, আজিয়াটা (টেলিকমিউনিকেশন), এয়ারএশিয়া (অ্যাভিয়েশন ও পর্যটন), পার্ডুয়া (অটোমোবাইল) এবং এমএমসি পোর্ট (বন্দর ও অবকাঠামো)। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার রোধ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও মালয়েশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্রের সংবাদ সম্মেলন :
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম এই সফরটি ছিল একটি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বহিঃপ্রকাশ। এই ১৮ ঘণ্টার কম সময়ে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্ব এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কুয়ালালামপুরে আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার পর সোমবার বিকেলেই মালয়েশিয়ার সফর শেষ করে চীনের ডালিয়ান শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম অ্যানুয়াল মিটিংয়ে (সামার ডাভোস) যোগ দেবেন।
ডালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ আজ :
মালয়েশিয়ায় দুইদিনে সফর শেষ করে গতকাল বিকালে চীনের ডালিয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ডালিয়ান রওনা হন। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বুঙ্গা রায়া কমপ্লেক্সের এক্সক্লুসিভ ভিভিআইপি টার্মিনালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলফিকলি হাসান। এই সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার মনজুরুল করিম ও ডেপুটি হাই কমিশনার শাহানারা মলিকা উপস্থিত ছিলেন। গত রোববার দুই দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া আসেন।
